বাঁশখালীর উপকূল জুড়ে চলছে লবণ উৎপাদন  

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ০৬:৩১

বাঁশখালী উপজেলায় উপকূল জুড়ে চলছে লবণ উত্পাদন। বর্ষা শেষে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও মাঠে নেমে পড়েছেন উপকূলের লবণচাষিরা। বর্ষার চিংড়ি ঘের শেষে লবণ উত্পাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবেষ্টিত বিভিন্ন ইউনিয়নে ৫০ হাজার লবণচাষি চাষ শুরু করছেন।

বাঁশখালী উপজেলার কাথরিয়া, বাহারছড়া, সরল ও গন্ডামারা, ছনুয়া উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লবণ উত্পাদন করে যাচ্ছেন চাষিরা। পরিবারের সদস্য ও চুক্তিকৃত লবণ শ্রমিকদের নিয়ে চলছে লবণ মাঠ তৈরির ধুম। বর্ষা মৌসুমে চিংড়ি ঘের ও অন্যান্য মাছ চাষে ব্যবহার হওয়ায় উঁচুনিচু ও আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে মাঠগুলো। তাই উত্পাদনের শুরুতেই মাঠ তৈরিতে ব্যয় করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি চলে তাদের এই মাঠ তৈরির কাজ। কেউ কেউ আবার নিজেই মাঠে রান্না করে খাচ্ছেন। অনেকে আবার আগাম সময়ে দ্রুত মাঠ তৈরি শেষে নিজেদের রপ্ত কৌশলে জমিতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি জমিয়ে তাতে সূর্যের তাপ দিয়ে পানি শুকিয়ে তৈরি করছেন লবণ। মূলত প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস থেকে পরের বছরের জুন মাস পর্যন্ত চলে এই লবণ উত্পাদন মৌসুম।

চাষিরা জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে প্রায় পানির দরেই লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তবে সমপ্রতি নানামুখী পদক্ষেপের কারণে লবণের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণ উত্পাদনে আশার আলো দেখছেন তারা। জানা যায়, এই বছর বাঁশখালী উপজেলার সরল, গন্ডামারা, শেখেরখীল, পুইছড়ি, ছনুয়া, কাথরিয়া, খানখানাবাদ ও বাহারছড়া ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকার ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে লবণ চাষ করা হচ্ছে। চাষিরা নিজেদের জমি বা লিজ নিয়ে এই লবণ চাষ করে। অনেকে আবার জমি মালিকের সঙ্গে ভাগাভাগিতে চাষ করে। চলতি মৌসুমে গত মৌসুমের ১ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। তা ছাড়াও বর্তমান প্রতি মণ লবণের বাজার মূল্য ২৫০-৩০০ টাকা। শেখেরখীল ইউনিয়নের লবণচাষি জসিম উদ্দীন বলেন, আমি এই বছর ২২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে লবণ চাষ করছি। শ্রমিক, পানি ও অন্যান্য খরচ বাবদ ৪ লাখ টাকা খরচ হবে আমার। মাঠ তৈরি শেষের পথে। আশা করি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহে লবণ উত্পাদন শুরু করতে পারব। তবে গত মৌসুমে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মাঠে গর্ত করে রাখা ৬০০ মণ লবণ নিয়ে চিন্তায় আছি। পশ্চিম বাঁশখালী লবণ উত্পাদনকারী সমিতির নেতা মাওলানা বশির আহমদ জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে সোডিয়াম সালফেটের আড়ালে লাখ লাখ টন সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্যলবণ) আমদানি হওয়ার কারণেই মূলত মাঠে উত্পাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে উপকূলের লবণচাষিরা।

লবন স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

উত্তর-পশ্চিম গন্ডামারা লবণ উত্পাদন সমিতির উপদেষ্টা আবু আহমদ জানান, বর্তমানে প্রতি বস্তা (দুই মণ) লবণ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা করে। অথচ চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছে ধোলাই খরচসহ ১৯০, ২১০ ও ২২০ টাকা করে। সে ক্ষেত্রে লবণের প্রকৃত মূল্য পাওয়া গেছে ১৬০, ১৮০ ও ১৯০ টাকা করে। অথচ প্রতি মণ লবণ উত্পাদনে কৃষককে গুনতে হয়েছে গড়ে ২৪৭ থেকে ২৫০ টাকা। তাছাড়া শিল্প আই আরসি ও ব্যাক টু ব্যাক এলসির সুবিধা নিয়ে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইডের আড়ালে সরাসরি অতিরিক্ত লবণ আমদানি করায় দেশের বাজারে প্রচুর লবণ চলে আসায় মাঠে উত্পাদিত লবণের দাম পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি। ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হারুন বলেন, লবণ চাষ পশ্চিম বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার মানুষের আয়ের মূল মাধ্যম। লবণ উত্পাদনের মৌসুমের আয়ে চলে তাদের সারা বছরের সংসার। বাঁশখালী উপজেলার উপকূল জুড়ে চলছে লবণ উত্পাদনের জোর প্রস্তুতি চলছে।

বাঁশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেহ বলেন, গত বছরের নভেম্বর থেকে ধানের চাষ শেষ। প্রায় ৫০ হাজার কৃষক এখন লবণ উত্পাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, লবণের দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করব।

 

 

 

 

 

ইত্তেফাক/ইউবি