বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্নীতিতে ডুবে আছে নার্সিং কাউন্সিল

রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পেলেন ‘অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত’ রাশিদা 

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ২০:৩২

বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলে দুর্নীতির অভিযোগ বেশ পুরোনো। কিন্তু গত এক দশক ধরে এখানকার দুর্নীতি অনেকটাই ওপেনসিক্রেট। বেসরকারি নার্সিং কলেজের অনুমোদনের নামে ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়ে ১৫-২০ লাখ টাকা করে আদায় করেছে এখানকার একটি সিন্ডিকেট।

অথচ নার্সিং শিক্ষা বা গবেষণার মান উন্নয়নে এই সময়ে নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। যখনই যে দায়িত্ব পেয়েছেন অবৈধ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে এটাকে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্হিতিতে ডেপুটি রেজিস্ট্রার রাশিদা আক্তারকে দেওয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব। অথচ ২০১৬ সালে তাকে যখন ডেপুটি রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতনসহ চারটি মামলা ছিল। এসব মামলার তথ্য গোপন করে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত হন তিনি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক মানের করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে যারা যোগদান করবেন তাদের শুরুর পদকেই দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করেন। বিশ্বমানের নার্সিং কাউন্সিল করার জন্য এখানকার প্রতিটি শিক্ষার্থীকে লেখাপড়ার পাশাপাশি হাতেকলমে প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ এখানে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তারা প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন। বেসরকারি নার্সিং কলেজের অনুমোদনের নামে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। লেখাপড়া বা গবেষণা কলেজগুলোতে ঠিকমতো হচ্ছে কি-না সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দেওয়া হয়নি। অবৈধ বাণিজ্যকেই তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।

এমন অভিযোগের মধ্যে গত ১৯ জানুয়ারি শেষ হয় রেজিস্ট্রার সুরাইয়া বেগমের চাকরির মেয়াদ। তখন থেকেই গুঞ্জন ছিল ডেপুটি রেজিস্ট্রার রাশিদা আক্তারকে এই পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেই গুঞ্জন সত্যি করে তিনিই দায়িত্ব পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর রাশিদার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্েতর জন্য সচিব, স্বাস্হ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ এবং মহাপরিচালক, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। দুদকের উক্ত চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগকারী দুই জন সোনালী রানী দাস এবং মো. সিদ্দিকুর রহমানের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন স্বাস্হ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম।

স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ করে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় ৩ জানুয়ারি যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত তদন্ত রিপোর্টে উঠে আসে রাশিদা আক্তার ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলে যোগদান করার সময় তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন ছিল। নিয়োগকালে প্রাক পরিচয়-যাচাই বা পুলিশ ভেরিফিকেশন না হওয়ায় ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও তিনি যোগদান করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি প্রতিষ্ঠানে ডেপুটি রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ না করে শুধু কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাও ছিল আরেকটি একটি বড় ত্রুটি। স্বাস্হ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এমন তদন্ত রিপোর্টের পরেও ডেপুটি রেজিস্ট্রার রাশিদা আক্তারকে রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

গত ১৩ জানুয়ারি গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে আব্দুর রহিম নামে এক ব্যক্তি স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্হ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করে রাশিদা আক্তারকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার না করার অনুরোধ করেন। তার দাবি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ চারটি মামলা থাকার পর তিনি ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পেতে পারেন না। ১৪ লাখ টাকা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, পিএইচডি ডিগ্রিধারী, এমপিএইচ করা অনেকেই আছেন। তাদের যে কাউকে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সবাইকে বাদ দিয়ে রাশিদা আক্তারকে নিয়োগের কারণ হিসেবে অবৈধ লেনদেন আছে বলেই মনে করেন আব্দুর রহিম।

সরেজমিন গিয়ে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইত্তেফাকের এ প্রতিবেদকের কাছে রাশিদা আক্তার বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘আমি দায়িত্ব পেয়েছি, এখন এই প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজাব। কিছু দুর্নীতির অভিযোগ আছে, সেগুলো কঠোরভাবে দেখা হবে।’ তার নিজের দুর্নীতি বা মামলার বিষয়ে কিছু বলতে চাননি।

স্বাধীনতা নার্সেস পরিষদের (স্বানেপ) মহাসচিব ইকবাল হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের নার্সিং সেক্টরকে প্রধানমন্ত্রী অনেক সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ঠিক সেই রকম একটি মুহূর্তে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে ত্রুটিযুক্ত অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কাউন্সিলের সর্বোচ্চ পদে পদায়ন করায় নার্সিং সেক্টরকে কলুষিত করা হচ্ছে।’ বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) সভাপতি ইসমত আরাও বলেছেন, ‘রেজিস্ট্রারের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশ্নবিদ্ধ কাউকে নিয়োগ করা ঠিক না। আমরা চাই নতুন যোগ্য ও দক্ষ একজন নার্সিং কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হোক।’

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন