মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় একটি হাতির শাবককে পোষ মানানো (স্থানীয় ভাষায় হাঁদানি) চলছে। হাতির বাচ্চা জন্মের আড়াই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তাকে পোষ মানাতে হয়। বেশ ব্যয়সাপেক্ষ এই কর্মযজ্ঞটি চলে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে।
২৪ জানুয়ারি উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের কাটাগাং গহিন জঙ্গল এলাকায় দেখা যায়, হাতির বাচ্চাকে পোষ মানানো হচ্ছে। এ কর্মযজ্ঞ দেখতে সেখানে ভিড় করছেন শ শ মানুষ। হাতি হাঁদানো কাজের কয়েকটি ধাপের প্রথম ধাপ শুরু হয় সোমবার দুপুর আড়াইটায়। প্রশিক্ষিত দুটি হাতি (শাবকের মা ও বোন) নিয়ে মাস্টারের (প্রশিক্ষক) নেতৃত্বে পাঁচ জন সহকারী প্রশিক্ষক ও কয়েক জন সহকারীসহ ১০-১২ জন মাহুতের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ কাজ চলে। নিয়ম মেনে প্রশিক্ষিত হাতিগুলো দিয়ে বাচ্চাটিকে বেষ্টন করে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। বাচ্চাটিকে বাঁধার কৌশলটাও ব্যতিক্রম। আগে থেকেই মাটিতে গাছের চারটি খণ্ড পুঁতে রাখা হয়। নির্ধারিত স্থানে যাওয়া মাত্র প্রথমে বাচ্চার গলা রশি দিয়ে গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়। একই সঙ্গে সামনের দুই পা সামনের গাছের সঙ্গে এবং পেছনের দুই পা পেছনের গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়। এ সময় বাচ্চা হাতি উচ্চ স্বরে চিৎকার দিতে থাকে এবং সমস্ত বাঁধন ছিন্ন করে মুক্ত হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে। মা হাতি সংযত রাখাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে বাচ্চাকে বাঁধতে প্রায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা লাগে। আর এর মধ্য দিয়েই হাতি হাঁদানোর প্রথম দিনের মূল কাজ শেষ হয়। দ্বিতীয় দিন বাচ্চাকে ছেড়ে প্রশিক্ষিত দুটি হাতি সহযোগে কোনো এক ছড়ায় নিয়ে গোসল করানোসহ ৪-৫ ঘণ্টা ঘুরিয়ে আবার নির্ধারিত স্থানে এনে বেঁধে রাখা হয়। এভাবে চলবে তিন মাস। এ সময়ে বাচ্চার পায়ে ঘা হয়, ঘা থেকে পচন ধরে। তবে খাদ্য ও চিকিৎসা দেওয়া হয় নিয়মিত।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাচ্চাকে বিভিন্ন সংকেত বুঝিয়ে দেওয়া হয়, শিখিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন কাজের কৌশল। প্রশিক্ষণ শেষ হলেই হাতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ। প্রশিক্ষিত হাতি দিয়েই গাছ টানা, পড়ে যাওয়া গাড়ি তোলা, অতিথিকে অভিবাদন জানানো, সার্কাসে খেলা দেখানোসহ বিভিন্ন কাজ করানো হয়। জুড়ী উপজেলার বাছিরপুর গ্রামের খলিলুর রহমান বলেন, হাতি শাবককে পোষ মানাতে এ হাঁদানি কার্যক্রম তিন মাসব্যাপী পরিচালিত হয়। হাতি হাঁদানি দেখে অনেকেই আলোচনা করেন রীতি-নীতির জন্য।
হাতির মাহুত আহমদ আলী পংকী জানান, মাস্টার (প্রশিক্ষক) আকবর আলীর নেতৃত্বে সহকারী প্রশিক্ষক রহমত আলী, ইছমাইল আলী, ফুলু মিয়া এবং আহমদ আলী পংকীসহ কয়েক জন সহকারী এই প্রশিক্ষণ কাজে অংশ নিয়েছেন। সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে ব্যয় হয় ২-৩ লাখ টাকা। মাস্টার আকবর আলী বলেন, তিন মাস পরেও প্রশিক্ষণের আরো কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। তা সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এই হাতিকে দিয়ে যে কোনো কাজ করানো যাবে। হাতি মালিক উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর নিবাসী নিপার রেজা জানান, হাতি প্রশিক্ষণের দৃশ্যটি দেখতে মানুষের জন্য আনন্দদায়ক হলেও প্রক্রিয়াটি বাচ্চার জন্য কষ্টদায়ক। তবুও তাকে পোষ মানানোর এ কাজটি না করলে হাতিটি জংলি হাতির মতো আচরণ করবে। মানুষের জানমালের ক্ষতি করবে। প্রশিক্ষণের জন্য এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি এখনো বাংলাদেশে নেই। প্রশিক্ষণকালে অসুস্থতার কারণে বাচ্চাকে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি ১৫-২০ হাজার টাকার ওষুধও খাওয়াতে হয়।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, লাইসেন্স নিয়েই মালিকেরা হাতি পোষেন এবং হাতি লালন-পালনের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে হাতিদের প্রশিক্ষণে উন্নতমানের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। বন্যপ্রাণী বিভাগের পক্ষ থেকে এসব প্রশিক্ষণের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
