‘যে যুদ্ধ ভালোবাসাবৎ সেখানে পরাজয় নেই’

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:১৫

দ র্শনের অর্থাৎ সঠিক জীবনদর্শনের হাতিয়ার ছাড়া জীবনের কোনো কিছুরই গ্রন্থিমোচন করা যায় না। যে কোনো প্রকার শিল্পের ক্ষেত্রে এ কথাটি আরো গভীরভাবে প্রযোজ্য। বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে তা বটেই। অথচ অনেক কবির অনেক কবিতায়ই সে রকম দর্শনের ছোঁয়া পাওয়া যায় না, অনেকে ভ্রান্ত দর্শনের গাড্ডায় পড়ে কবিতার মাধ্যমে ভ্রান্তিবিলাসেই মত্ত হয়ে থাকেন। সঠিক দর্শনের দর্পণে জীবনকে অবলোকন করতে পারে না বলেই এঁরা শব্দ নিয়ে খেলা করেন, শব্দ দিয়ে তৈরি জীর্ণ বাক্যকে ব্যঞ্জনাঋদ্ধ করে তুলতে পারেন না।

প্রকৃত কবি মোটেই এমন নন। কবিতার দেশ গানের দেশ বাংলাদেশ তো প্রকৃত কবিরই দেশ। সেই প্রকৃত কবিরাই এ দেশে আবহমানকাল ধরে জনগণ মন-নন্দিত হয়ে আসছেন। যুগে যুগেই এরকম কবির আবির্ভাব ঘটেছে, ঘটছে এ যুগেও। কামাল চৌধুরীকেও আমরা এ যুগের অন্যতম প্রকৃত কবিরূপে গ্রহণ করতে পারি। তাঁর নির্বাচিত কবিতার পাতা উলটিয়ে গেলেই যে কোনো পাঠক পাতায় পাতায় প্রকৃত কবিতার স্বাদ পেতে থাকবেন। কাদের জন্য তিনি কবিতা লেখেন, সে বিষয়টি খোলসা করে দেওয়ার জন্যই বইয়ের প্রথমে দিয়েছেন ‘জন্মের প্রার্থনা’ কবিতাটি। ‘কবরের প্রতীক্ষায় থাকা একজন বৃদ্ধ’, ‘খনি আর তাঁতকল ফেরা একজন শ্রমিক’, তারুণ্যের মিছিলে স্লোগান তোলা একজন তরুণ—পাড়াগাঁর বধূ আর কিশোরীরা যদি/আমার কবিতা পড়ে জলকেলি করে/কখনো-সখনো কাঁদে/একজন মাঝি যদি পাল ও বৈঠার প্রেমে/আমার কবিতা থেকে গান তুলে ছুড়ে দেয় মুগ্ধ হাওয়ায়/মুক্তিযোদ্ধারা যদি মৃত্যু ও বারুদের ঘ্রাণে/ভালোবাসে আমার কবিতা।

প্রার্থনা জানিয়েই কামাল চৌধুরী নিশ্চিন্ত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকেননি। তিনি জানেন, পরিশ্রমবিহীন প্রার্থনায় কৃষক যেমন কোনো শস্য উৎপাদন করতে পারেন না, তেমনি কবিও পারেন না কবিতা সৃষ্টি করতে। কবিকে অবশ্যই প্রতিভাবান হতে হয়, কিন্তু প্রতিভা স্বয়ংসিদ্ধ নয় কোনোমতেই। এর সঙ্গে প্রয়োজন বাস্তবের প্রতি সঠিক দৃষ্টিক্ষেপণ। বাস্তবের যথার্থ রূপ দেখতে হলে কেবল বর্তমানকে দেখলেই চলে না, ইতিহাসের আলোতে অতীতকেও দেখে নিতে হয়, বর্তমান আর অতীতের প্রেক্ষাপটে দ্রষ্টার চিত্তলোকে তখন ভবিষ্যতের রূপও ঝলসে ওঠে। এরকম দেখার জন্যই দরকার পড়ে দর্শনের আলোর। সঠিক দর্শনের সেই আলোকবর্তিকাটি হাতে নিয়েই কবি কামাল চৌধুরী নিজে যা দর্শন করেছেন, অন্যকেও তা দর্শন করাতে প্রবৃত্ত হয়েছেন।

দর্শনের আলোকবর্তিকা হাতে নিয়েও যদি বলি, সাংবাদিকের চোখ দিয়েই তিনি সব কিছু দেখছেন, তবে কবি হিসেবে তাঁকে ছোট করা হবে কি? না, আমি তা মনে করি না। সংবাদকেই তো তিনি কবিতা করে তুলেছেন, ‘সংবাদ মূলত কাব্য’—এমনটিই হয়ে উঠেছে তাঁর হাতে। তবে এ দেশের এখনকার সব সংবাদকেই তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমিতে রেখে। সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ তাঁর কবিতায় বারবারই ঘুরে ঘুরে এসেছে—কখনো স্পষ্ট প্রত্যক্ষতায়, কখনো পরোক্ষ ইঙ্গিতময়তায়। তাই বলে শুধু মুক্তিযুদ্ধ বা বঙ্গবন্ধু নয়, কিংবা শুধু সমকাল বা নিকট-অতীতকাল নয়—সংবাদ সচেতনতার মতো সমমাত্রায়ই দৈশিক ও বৈশ্বিক ঐতিহ্য চেতনায় স্নাত এই কবি লিখতে চান—লক্ষ লক্ষ অমর কবিতা/রবীন্দ্রনাথের মতো স্থিতধী, নজরুলের মতো বেগবান/নেরুদার মতো সচেতন এবং কঠোর।/এই চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করতেই তিনি সদা ঘনিষ্ঠ।

কবিতায় প্রায় সব অগ্রজ কবির প্রতিই তিনি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। কবি হাসান হাফিজুর রহমানকে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের সঙ্গী হয়ে/একুশের ভোরের আলোয়/...শোকার্তের ক্ষুব্ধ তরবারি’ হাতে তুলে নিতে তিনি দেখেছেন এবং তা থেকে নিজেও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আর প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানকে স্মরণ করতে গিয়ে তিনি স্পষ্টই বলে ফেলেছেন—সব মানুষের কাছে আমাদের ঋণ নেই, কিছু মানুষের কাছে থাকে। কারণ—কেউ কেউ আছে, যারা আকাশের মতো উঁচু/অন্ধকারে অনেক অনেক চাঁদ বুকে নিয়ে তারা বাতিঅলা/শীতে কাঁপা মানুষের কাছে তারা রোদ, চাদরের দারুণ আশ্রয়/তাদের সবুজ ছায়া এই দুঃখী বাংলাদেশে চিরকাল বটের উপমা।

শামসুর রাহমানের মতোই কবিতায় কামাল চৌধুরীও হতে চান বাতিঅলা, রোদ, সবুজ ছায়া ও বটের উপমা।

হাসান হাফিজুর রহমান বা শামসুর রাহমান এবং বিগত শতকের পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের অনেক কবিই কলকাতাকেন্দ্রিক তিরিশের কবিতার ধারার সঙ্গে সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের কবিতাকে যুক্ত করে দেওয়ার প্রয়াসী হয়েছিলেন। পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক পশ্চাত্পদতার হাত থেকে আমাদের কবিতা তথা শিল্পসাহিত্যকে মুক্ত করাই ছিল তখন তাঁদের লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্যের পথ ধরে চলতে গিয়েও স্বদেশ ও স্বকালের নানাবিধ বিশেষ সমস্যা-সংকট-সম্ভাবনার দিকে তাঁদের চোখ ফেরাতে হয়েছে এবং নতুনতর কর্তব্য-চেতনায় তাঁরা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। একসময় পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকেই প্রত্যাখ্যান করে কলমযোদ্ধারূপে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠেছেন। শামসুর রাহমানকে তো দেখেছি সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম চলার সময় স্বদেশে প্রায় বন্দিদশায় অবস্থান করতে বাধ্য হয়েও তিনি ‘বন্দিশিবির থেকে’ লিখে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কবিতার অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সফল সমাপ্তির পর স্বাধীনতার শত্রুদের ষড়যন্ত্রে স্বাধীন দেশটিকে যখন উদ্ভট উটের পিঠে চড়ে বসতে দেখেছেন, তখনো তাঁর কবিতায় ‘খরবাক্য ঝলসে’ উঠেছে।

শামসুর রাহমানের উত্তরসূরিরূপেই কামাল চৌধুরী নিজের ‘বিক্ষোভের মধ্যে অনেকের বিক্ষোভ’কে ভাষারূপ দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাই তিনিও হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের কবি। আমরা প্রায়ই বলে থাকি—‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অসমাপ্ত রয়ে গেছে।’ অথচ সেই অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি সাধনের দায়িত্ব যে আমাদের ওপরই বর্তেছে এবং যার যার অবস্থান থেকে প্রত্যেককেই যে সেই দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে—সে বোধ কি আমাদের আছে? থাকলে পরিস্থিতি নিশ্চয়ই অন্যরকম হতো।

যাঁদের ভেতর আছে কবিত্ব, কবি জীবনানন্দের ভাষায়—‘যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে’ সেই কবিদের তো কবিতাকেই নতুন মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র বানিয়ে তুলতে হবে। সব কবির এই বোধ না থাকলেও কবি কামাল চৌধুরীর তা আছে। তাই তিনি ‘বিশুদ্ধ কবিতা’ সৃষ্টির অশুদ্ধ ও অশুভ চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন। তথাকথিত বিশুদ্ধ কবিতার কবিরা তো সবার কবি হন না। হতে চান না। কামাল চৌধুরী এরকম বিশুদ্ধ কবি নন বলেই সবার না হলেও ‘অনেকের কবি’ হওয়ার জন্য তাঁর প্রযত্ন। সেজন্যই তাঁর কবিতা দুর্বোধ্যও নয়, ‘দুরূহ’ও নয়।

কামাল চৌধুরীর নির্বাচিত কবিতার মলাটলিপিতে বলা হয়েছে ‘শৈলীগত সৌকর্য ও পরিমিতিবোধ কামাল চৌধুরীর কাব্যচিন্তাকে শিল্পোত্তীর্ণ করেছে। অক্ষরবৃত্তে আর মাত্রাবৃত্তে তার অনায়াস দক্ষতা, মিলবিন্যাসে স্বাভাবিক নৈপুণ্য তার কবিতার শিল্পগত অনন্যতার অন্যতম উপাদান।’

হ্যাঁ, ‘অন্যতম উপাদান’ বটে, কিন্তু এটিই তাঁর ‘অনন্যতার’ মূল উপাদান নয়। ‘শিল্পোত্তীর্ণ’ না হলে কোনো কবিতাই প্রকৃত কবিতা হয় না—এ তো সর্বজনস্বীকৃত সত্য। কিন্তু এই ‘সত্যকে নিয়ে যে অনেক সময়ই বাড়াবাড়ি করা হয়, সে কথাটিও একান্ত সত্য। কোনো কবিতার ভাব বা বক্তব্যের প্রতি একটুও নজর না দিয়ে বিশুদ্ধতাপন্থি কাব্য সমালোচকরা কেবল ছন্দ, শব্দ বা ধ্বনির কারিগরির মধ্যেই কবিতার উৎকর্ষকে অবলোকন করতে চান।

‘বিশুদ্ধতাপন্থি’ কবিদের কবিতার সমালোচকদেরও বিশুদ্ধতার পন্থানুসারী হয়েই এরকম করতে হয়। কিন্তু অগ্নিগর্ভ সত্তরের অন্যতম প্রধান কবি কামাল চৌধুরীর কাব্যসাধনার মূল্যায়ন এভাবে করা চলে না। কেবল শৈলীগত সৌকর্য দিয়ে কামাল চৌধুরী ও তাঁর সমগোত্রীয় কবিদের কবিতার মূল্য বিচার করলে সে বিচার হবে ভ্রান্ত ও একদেশদর্শী। রবীন্দ্রোত্তর ‘আধুনিক’ কবিদের অনেকে শৈলীগত সৌকর্যের সাধনায় মেতে থেকে জীবনের অখণ্ড রূপকে উপেক্ষা করে ভ্রান্ত পথের পথিক ও একদেশদর্শী হয়ে উঠেছিলেন।

বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য আমাকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের শরণ নিতে হচ্ছে। আইয়ুব ত্রিশের ‘আধুনিক’ কবিতার দুটি প্রধান দুর্লক্ষণকে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর ভাষায়—‘প্রথমটির মূলভাব-জগতের প্রতি বিতৃষ্ণা, দ্বিতীয়টির গোড়ার কথা—কবিতাকে বহির্জগতের কবি হৃদয়ানুরঞ্জিত উপলব্ধির বাহনজ্ঞান না করে দুর্ভেদ্য শব্দের আর্টিফ্যাক্ট ঠাহর করা। বর্তমান শতাব্দীর অধিকাংশ পাশ্চাত্য কবির ওপর এই দুটি প্রবণতার ছায়া পড়েছে, যেমন পড়েছে ১৯৩০-এর পর থেকে অধিকাংশ বাঙালি কবির ওপর।

এ কালের আধুনিক কবিদের মধ্যে যাঁরা এই দুটি দুর্লক্ষণকে পরিহার করে চলেছেন, তাঁদেরই একজন কামাল চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রকৃত কবি হওয়ার প্রকৃত পথটিই তিনি বেছে নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যকে ধারণ করে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ স্বীকার করে নিয়েই তাঁর পথচলা। কবিতার আধেয় বা বিষয়বস্তুকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কামাল চৌধুরীর কবিতার আসল বিষয় যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধের দর্শনই তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর সেই দর্শনই হয়েছে এই সময়কার সমস্যা-সংকটের গ্রন্থিমোচনের আয়ুধ। সেই আয়ুধের প্রয়োগেই তিনি কৃতজ্ঞদের মুখোশ উন্মোচন করেন, ওদের স্মরণ করিয়ে দেন—আমরা মুজিবের লোক/আমাদের বারুদগন্ধ মিশে আছে পতাকার রঙে/ত্যাগ ও মহিমা ভাষায়—/যে যুদ্ধ ভালোবাসাবত্/সেখানে পরাজয় নেই/সেখানে বিজয়ী জাতির রক্তে প্রতিদিন ভোর আসে/প্রতিদিন সূর্যোদয়ে/আত্মসমর্পণ করে হানাদার।...

না, এই স্থিতধী কবিকে কেউই তাঁর পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না। কবি-অকবি নির্বিশেষে সবাইকেই বরং তাঁর পথ ধরে হেঁটে রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে।

ইত্তেফাক/ ইআ