সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের পাটলাই নদীর বুকে বাঁধ দেওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে অন্তত ৫ কিলোমিটার জুড়ে নাব্য সংকট দেখা দেয়। এ সময় এই অংশে পানি শুকিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়ে ফসলি জমিতে সেচসংকট সৃষ্টি হয়। নৌ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। এ অবস্থায় এলাকার অন্তত দেড় লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকার সংকট দেখা দেয়।
এলাকাবাসী জানান, ভারতের মেঘালয় থেকে কয়লা ও চুনাপাথর আমদানির লক্ষ্যে বড়ছড়া শুল্ক স্টেশন চালু হয় ১৯৯১ সালে। পাহাড়ি খরস্রোতা পাটলাই নদী পথে এইসব পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ শুরু হয় তখন। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যায় বলে উজানে বড় নৌকাগুলো চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। তাই সীমান্ত এলাকায় পানির উচ্চতা ধরে রাখতে ডাম্পের বাজার ও নয়াবাজারে দুটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধ দুটি নির্মিত হয় মূলত কয়লা পরিবহনের সুবিধার কথা চিন্তা করে। কয়লা ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা এটি তৈরিতে সহয়তা দিলেও এখন এটি গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। এদিকে দীর্ঘ কয়েক বছরে নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব শুরু হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানি ভাটির দিকে নামতে পারে না। আর বর্ষায় ঢলে বাড়িঘরের ক্ষতি হয় বলে জানান, বালিয়াঘাটের বাসিন্দা মোশাহিদ খাঁন স্বপন ও দুধের আওটা গ্রামের বাসিন্দা মো. মমরুল ইসলাম। তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে পাটলাই নদী খনন ও বাঁধ অপসারণ এখন সময়ের দাবি।
তাহিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবীর বলেন, বাঁধের কথা শুনেছি। সরেজমিনে দেখে তা অপসারনের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, তাহিরপুরের সীমান্ত নদী পাটনাই ও বৌলাই নদী খননের একটি ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, ৯১ সালে বড়ছড়া শুল্ক স্টেশন চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসমে ডাম্পেরবাজার ও নতুনবাজার এলাকায় বাঁধ দিয়ে পাহাড়ি পাটলাই নদীর পানি আটকে পাঁচ কিলোমিটার পথ ছোট ছোট নৌকা দিয়ে চার-পাঁচ টন করে কয়লা, পাথর ভর্তি নৌকা ডাম্পেরবাজার পর্যন্ত নিয়ে এসে সেখানে আনলোড করা হয়। এরপর সেখান থেকে ছোট ট্রলি ও পিকআপে করে নিয়ে বড় বাল্কহেড বা ট্রলারে তুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব মালামল পাঠানো হয়। কিন্তু বছর বছর নদীর বুকে বাঁধগুলো থাকায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পলি ও বালিতে শ্রীপুর পর্যন্ত নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
তাহিরপুরের কয়লা ব্যবসায়ী রাজেশ তালুকদার বলেন, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন পানি আটকানো হয় না। ছোট ছোট ট্রলি দিয়ে মাল এনে ডাম্পেরবাজার পর্যন্ত মাটির বাঁধের ওপর দিয়ে কয়লা পরিবহন করা হয়। রাজেশ জানান, নদী খননের বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে আবেদন করা হয়েছে। তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, পাটলাই খনন হলে মাটিয়ান হাওরসহ ছোট-বড় হাওরের ফসলি জমি অকাল বন্যা থেকে রক্ষা পাবে। বর্তমানের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি কয়লা আমদানি করা সম্ভব হবে। তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বলেন, বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় পাটলাই নদীর বুকে বিদ্যমান বাঁধটিতে এখন পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই বাঁধের ওপর দিয়ে ট্রলি দিয়ে কয়লা, চুনা পাথর বহন করা হচ্ছে।
