রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার (ট্রেইনি) পদে বদলি হয় না দীর্ঘদিন। অনেকে এই পদে আছেন ১০ বছর থেকে এক যুগ পর্যন্ত। অথচ তিন বছর পর তাদের এই পদে থাকার কথা নয়। উচ্চতর ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়নরত চিকিৎসকদের মেডিক্যাল অফিসার (ট্রেইনি) পদে তিন বছর প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিডফোর্ট হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দেড় শতাধিক মেডিক্যাল অফিসার (ট্রেইনি) পদ আছে। কেউ তদ্বির করে, কেউ টাকা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চর দখলের মতো এই পদে থাকছেন।
এমনকি অনেককে পদোন্নতি দিয়ে ঢাকার বাইরে বদলি করলেও তারা রাজধানী ছাড়তে চান না। তারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাফ জানিয়ে দেন, আমাদের পদোন্নতির প্রয়োজন নেই। আমরা ঢাকায় থাকব। এমনকি ক্ষমতার দাপটও দেখান অনেকে, বলেন পারলে সরিয়ে দেখান। এর সত্যতাও স্বীকার করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) এক শ্রেণির নেতাকে ম্যানেজসহ নানাভাবে তদ্বির করে এই পদে অনেকে থাকছেন বছরের পর বছর। এতে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই কারণে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে গিয়ে অনেকে সঠিক প্রশিক্ষণও পাচ্ছেন না। এখন সবার একটাই প্রশ্ন, মেডিক্যাল অফিসার (ট্রেইনি) পদে কী এমন মধু আছে ? রাজধানীতে থাকতে তাদের এত আগ্রহ কেন? অভিযোগ উঠেছে, ওই সকল চিকিৎসকরা প্রতি বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে প্র্যাকটিস এবং অপারেশনও করছেন। অথচ বদলি করলে তারা সেখানে যান না।
গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালক (প্রশাসন) কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় অর্ধশত চিকিৎসক অনেকটা অসহায়ের মতো আবেদনের ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রতিদিনই সারাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আসছেন। তারা এই প্রতিনিধিকে বলেন, আমাদের মতো এখানে প্রতিদিন অনেকে এসে আবেদন জমা দিয়ে যান। মাসের পর মাস এই আবেদনের কোন জবাব পাই না। কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতেও নানা তদ্বির করতে হয়। কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচার-আচরণ ও ব্যবহারে আমরা অপমানিত হচ্ছি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তারা বলেন, চিকিৎসক হওয়াটা কি আমাদের অপরাধ? চিকিৎসকদের এই ধরনের হয়রানি চলতে থাকলে, তদ্বির ও ঘুষকে যদি প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে চিকিৎসা পেশার মতো মহান পেশায় আসতে তরুণ প্রজন্ম নিরুত্সাহিত হবে।
বিএমএ ও স্বাচিপ নেতারা বলেন, মেডিক্যাল অফিসার (ট্রেইনি) পদে তিন বছর থাকার নিয়ম আছে। কিন্তু তারপরও এর বেশি সময় ধরে এই পদে কেউ থাকলে সেটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যর্থতা। এর কোন যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিএমএ ও স্বাচিপের এক শ্রেণির নেতা মুখে বলেন এক কথা, কাজ করে আরেকটা। যখনই তিন বছর অতিক্রম হওয়ার পর কাউকে বদলি করা হয়, তখনই বিএমএ ও স্বাচিপের এক শ্রেণির নেতা ক্ষেপে যান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অফিস ঘেরাওয়ের মতো কাণ্ড ঘটান। নানা ধরনের অকথ্য ভাষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা তাদের হাতে লাঞ্চিতও হয়েছেন। দলের লেবাসে এক শ্রেণির চিকিৎসক তদ্বির, নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডারবাজি করছেন। এটাই তাদের পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালের এই পদটি নিয়ে আমরা একটি সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিন বছর এই পদে থাকার পর পদ ছেড়ে দিতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আর এটা বাধ্যতামূলক হলে কেউ আর তদ্বির করবে না। অটোমেটিক পদ ছাড়তে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম বলেন, এতদিন মেডিক্যাল অফিসার (ট্রেইনি) পদের সিস্টেমটি এলোমেলো ছিল। এক্ষেত্রে একটি সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। যাদের ট্রেনিং প্রয়োজন তাদের অবশ্যই সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, সিস্টেম থাকার পরও না পারার যুক্তি দাঁড় করানো এক ধরনের ব্যর্থতার পরিচয়। বদলির নিয়ম এত বছর কেন বাস্তবায়ন করা হলো না? এটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যর্থতা।
স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ বলেন, এই পদে অবশ্যই নতুনদের সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
