প্রথমে বাসের ড্রাইভার ও হেলপারকে জিম্মি করে বাসটি নিয়ন্ত্রণ নেয় ডাকাতরা। এরপর বাসটি নিয়ে ঢাকা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে থাকে। এরমধ্যেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে যাত্রীদের হাত-মুখ বেঁধে তাদের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদের নির্জন স্থানে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। রবিবার (৩০ জানুয়ারি) রাতে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি ডাকাতদলের মূলহোতাসহ ৮ সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকেই জানা যায় ডাকাতির এমন কৌশল।
গ্রেফতাররা হলেন নাঈমুর রহমান নাঈম, আবু জাফর বিপ্লব, সজিব মিয়া, জহুরুল ইসলাম, আলামিন, দিলিপ সোহেল, আলামিন ও শাহনেওয়াজ ভূঁইয়া আজাদ। রবিবার রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাপাতি, ৪টি ছুরি, ৫টি লোহার রড, চোখ বাঁধার কাজে ব্যবহৃত ৩টি গামছা, মোবাইল ১০টি, খেলনা পিস্তল ২টি ও নগদ ৯ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া আরেকটি ডাকাত দলের ৮ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপির ডিবি তেজগাঁও বিভাগ। গ্রেফতাররা হলেন মোজাম্মেল হোসেন আপেল, জাহাঙ্গীর আলম, জমির খান, মজিবর রহমান মজিদ, মাসুম গাজী, শফিকুল খরাদি, কুদ্দুস আলী ও কাউছার মিয়া। তাদের কাছ থেকে ডিবির নকল জ্যাকেট, একটি দুনালা বন্দুক, একটি ওয়্যারলেস সেট, একটি হ্যান্ডকাফ, ছুরি ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে এ বিষয়ে মিন্টু রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান হাফিজ আক্তার জানান, চলতি মাসের গত ২০ জানুয়ারি দিবাগত রাতে টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) শফিকুল ইসলাম তার বন্ধুসহ উত্তরা পশ্চিম থানাধীন আব্দুল্লাহপুর পেট্রোল পাম্পের সামনে থেকে টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে আর কে আর পরিবহন নামক বাসে উঠেন। পরে তার বন্ধুসহ তাকে বাসে উঠা মাত্রই ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুই হাত ও চোখ বেঁধে ফেলে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা নগদ এক লাখ ১৫ হাজার টাকা, বিকাশে থাকা ৫ হাজার টাকা ও ব্যাগে থাকা ২টি ব্যাংকের এটিএম কার্ড দিয়ে আরও এক লাখ ৫০ হাজার টাকা সহ মোবাইল ফোন ও অন্যান্য জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয় ডাকাতরা।
হাফিজ আক্তার বলেন, এই ডাকাত দলটি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আর.কে.আর পরিবহনের একটি বাসকে ভাড়ার কথা বলে সাভারের গেন্ডা এলাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে ডাকাতরা প্রথমে বাসের ড্রাইভার ও হেলপারকে জিম্মি করে বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে বাসটি নিয়ে ঢাকা মহানগর এলাকার বিভিন্ন সড়কে ঘুরতে থাকে। আর টার্গেট করে যাত্রী উঠা পরবর্তীতে যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে, হাত-মুখ বেঁধে তাদের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদের নির্জন স্থানে নামিয়ে দেয়। এই চক্রটি ঢাকা জেলার সাভার, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে একইভাবে ডাকাতি করে। ডাকাতদের নামে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া বাস ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে ডাকাতরা নিজেদের সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঐ চিকিৎসক ডাকাতির ঘটনার পর বিভিন্ন থানায় ঘুরেছেন মামলা করার জন্য। কিন্তু তিনি প্রথমে কোনো আইনি সহায়তা পাননি। এক্ষেত্রে ডাকাতির ঘটনার পর ভুক্তভোগী কিভাবে আইনি সহায়তা নিতে পারেন এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান বলেন, বাসে ডাকাতির ক্ষেত্রে চলার পথ থেকে শুরু করে বাসটি যে এলাকা দিয়ে যাবে এবং বাসটি যে এলাকায় যাত্রা শেষ করবে সেসব এলাকার যেকোনো থানায় ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারবেন। এই ঘটনায় মামলা নেওয়া নিয়ে গরিমশি সম্পর্কে আমরা জেনেছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। যেকোনো ঘটনা ঘটলেই অভিযোগ করতে নিতে হবে। নাহলে আমরা অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে পারব না। আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জেনে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছি। এরপরই গ্রেফতারদের একাধিক ডাকাতির ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। এছাড়া ডাক্তার সাহেব রবিবার উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করে গেছেন। উনি যেহেতু উত্তরা থেকে উঠেছেন সেজন্য উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলাটি করেছেন। মামলা না হলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর যেসব থানা প্রাথমিকভাবে মামলা নিতে চায়নি তারা হয়তো চিন্তা করেছে বাসটি কোথায় থেকে আসছে কিভাবে গ্রেফতার করবে এসব বিষয়। তবে এটা ঠিক কাজ হয়নি। এ বিষয়ে ওইসব থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।
ডাকাতির মামলা বেশি হয়ে গেলে ডিএমপির পক্ষ থেকে ওই সংশ্লিষ্ট থানার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন নির্দেশনা আছে কিনা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন কোনো চাপ ডিএমপির পক্ষ থেকে নেই। যেকোনো ঘটনার মামলা থানাকে অবশ্যই নিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় ডাকাতির মামলা নিয়ে অনেক কাজ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে অনেক থানা মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। কিন্তু এই বিষয়ে শক্তভাবে বলা হয়েছে মামলা নিতে, না হলে ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাবে। আরও বলা আছে সম্পত্তি বিষয়ক যেকোনো অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ করতে হবে।
ডাকাতির সময় হাইওয়ে পুলিশ তাদের সহায়তা করে, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা এমন কোন তথ্য দিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান বলেন, এমন কোন তথ্য আমাদের দেইনি গ্রেফতাররা, যে ডাকাতিকালে তাদেরকে পুলিশ সহায়তা করে। আমরা যখনই কোনো ডাকাত চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করি দেখা যায় মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা আবার জামিনে বের হয়ে একই পেশায় যুক্ত হয়। তাদের গ্রেফতার করতে যত সময় লাগে, এরপরে আবার জামিন নিয়ে বের হয়ে যায়।
বাস কর্তৃপক্ষ ডাকাতদের সঙ্গে জড়িত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বাসের কর্তৃপক্ষের কোনো জড়িত থাকার প্রমাণ আমরা পাইনি। সাধারণত দেখা যায় ডাকাত দলের সদস্যরা বাসটিকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা দিয়ে ভাড়া করে। তারা তাদের সুবিধা মত জায়গায় যাওয়ার পর বাসের চালক ও হেলপারকে জিম্মি করে ফেলে। আবার অনেক সময় কম যাত্রী দেখে বাসে উঠে ডাকাতরা চালক ও হেলপারকে জিম্মি করে ফেলে।
১২ ঘণ্টা ধরে বাসটিতে ডাকাতি চলল, কোনো একটি পুলিশ চেকপোস্টে কেন তা ধরা পড়েনি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাতে অনেক গাড়ি এক সঙ্গে চলাফেরা করে। দেখা যায় রাস্তায় ৫০০ টি গাড়ি একসঙ্গে চলছে এর মধ্যে একটি বাসে ডাকাতি চলছে। সে কারণে তারা নজরদারিতে আসেনি।
