শিক্ষাব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা, দায় কার?

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২১:৪৬

শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে অনেক আগেই। দেশে শিক্ষার চরম বাস্তবতা এখন সনদকেন্দ্রিক। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই এখন সনদ অর্জন করা। করোনা মহামারির মধ্যে সনদ কেন্দ্রিক পড়াশোনার ধারণাটাও মহামারির আকার ধারণ করেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে শুনেছি, তাদের দাবি একটাই—পাঠদান হোক বা না হোক পরীক্ষা নিয়ে যেন দ্রুত শিক্ষাবর্ষ শেষ করে দেওয়া হয়। এটা কেমন অদ্ভুত দাবি! পড়ালেখা কিছুই হলো না অথচ ঐ বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে পরের ধাপে পার হয়ে গেলাম? এমনিতেই দেশের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা করানো হয়। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই অদ্ভুত ধারণা বিদ্যমান। সেখানে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে সিলেবাসভিত্তিক কিছু রসহীন কথা দায়সারাভাবে বলে যাচ্ছেন। এতে শিক্ষার প্রকৃত যে উদ্দেশ্য সেটা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান হবে উন্মুক্ত। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কোনো বিষয়ে অবাধ আলোচনা হবে। একটি বিষয়ে জ্ঞানের আদান-প্রদানের মাধ্যমে বা আলোচনার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি হবে? জাতীয়- আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। সমস্যার সুস্পষ্ট সমাধান আসবে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা হয় না। সেখানে সিলেবাসসর্বস্ব গতানুগতিকভাবে কিছু বিষয়ের ওপর গত্বাঁধা আলোচনা করা হয়। এতে এক জন শিক্ষার্থী যে বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করে, সে বিষয় সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পায় না। আর দেশে তো বিসিএস উন্মাদনা আছেই। এক জন শিক্ষার্থী এখন নিজ বিভাগের নামের সঙ্গে পরিচয় না দিয়ে যদি বলে আমি বিসিএস ১ম বর্ষ বা ২য় বর্ষ এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না।

দেশে শিক্ষার বাস্তব চিত্র সবচেয়ে করুণভাবে ধরা দেয় যখন আমরা দেখি যে, আন্তর্জাতিক মানের ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক বিষয়। গবেষণায় আমাদের অনীহা। দেশে অসংখ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে, যারা একমাত্র প্রমোশনের জন্য গবেষণা করে থাকেন। এমন কি তাদের এসব গবেষণাও অন্যের থেকে ধার করা।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু দক্ষ জনসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। আমরা মাথা কাজে লাগাচ্ছি না। অধিকাংশ সময় মুখস্থ বিদ্যার ওপর ভর করে একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করলেও বিশ্ববাজারে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারছি না। আমরা শিক্ষার দিক থেকে খুব দ্রুত গতিতে অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি।

গত কয়েক বছরে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, পাশের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার হার প্রতি বছর হাজার-হাজার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা দেশ, জাতি এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুই জানে না এবং অন্যান্য বিষয়েও নুন্যতম সাধারণ জ্ঞান নেই। এমন কি জাতীয় দিবস সম্পর্কেও তাদের ধারণা নেই। শুধু জিপিএ-৫ পেতে হবে অথবা ভালো রেজাল্ট করতে হবে— এই উন্মাদনায় সিলেবাসভিত্তিক কিছু পড়াশোনা করেই ক্ষ্যান্ত দিয়েছে।

বর্তমানে দেশে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পাঠ্যসূচির পরিবর্তনের চিন্তা সবাই করেন। কিন্তু শিক্ষার প্রাণ সংশোধনের দিকে মোটেই মনোযোগ দেওয়া হয় না। অর্থাৎ, শিক্ষক ও শিক্ষাগুরুর চারিত্রিক সংশোধন এবং সংস্কারসুলভ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয় না। ফলে হাজারো চেষ্টা যত্নের পরও কৃতী পুরুষের সৃষ্টি হয় না, যার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও বলিষ্ঠতা অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং অন্যকে প্রশিক্ষণ দিতে পারে।

একথা অনস্বীকার্য যে, শিক্ষকমণ্ডলী যে ধরনের জ্ঞান গরিমা ও চরিত্রের অধিকারী হবেন, তাদের ছাত্র সমাজও তাদের মতোই হতে পারবে। এ কারণে শিক্ষাকে কল্যাণকর ও উন্নত করতে হলে পাঠ্যসূচির পরিবর্তন-পরিবর্ধনের চাইতে শিক্ষকদের শিক্ষাগত, কর্মগত ও চরিত্রগত অবস্থার প্রতি অধিক নজর দেওয়া আবশ্যক।

এটা বলা ন্যায়সঙ্গত হবে যে, গত ৫০ বছরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শ্রেণিকক্ষগুলি আকার এবং সংখ্যায় বেড়েছে, কিন্তু তাদের চরিত্রে তেমন পরিবর্তন হয়নি; শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া বহুলাংশে একই মৌলিক প্যাটার্নে অব্যাহত আছে। শিক্ষাব্যবস্থায় সুষ্ঠু, স্থির এবং ইতিবাচক মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। যেখানে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী তাদের মূল পরিচয়ভিত্তিক কর্মকাণ্ড করবে। শিক্ষার্থীর কাজ হবে শেখা আর শিক্ষকের কাজ হবে শেখানো।

একটি জাতি যদি আত্মিকভাবে বিলুপ্ত হতে চায়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলেই যথেষ্ট হবে। জাতিগতভাবে আমরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গেছি। নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই শিক্ষার বিষয়টাকে বিনিময়কেন্দ্রিক এবং দায়সারা বিষয় হিসেবে পরিণত করেছি। শিক্ষাব্যবস্থার এই অন্তঃসারশূন্যতার দায় কার?

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন