পুরোনো আমাশয়ের ভোগান্তি নিয়ে এসেছেন রুহুল আমীন, ডায়রিয়ার পর চিনচিনে পেট ব্যথা আর শারীরিক দুর্বলতায় নিয়ে হাজির সফিকুল, সর্দিজ্বর ও বেদম কাশি নিয়ে উপস্থিত হাফিজুর শেখ। দেখতে দেখতে ভিড় জমান জনাবিশেক রোগী। সবার পোশাকআশাকেই দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচসিপি) রোগের বিবরণ শুনছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। নাম ঠিকানা রেজিস্ট্রি খাতায় উঠিয়ে ওষুধ দিচ্ছেন। এন্টিবায়োটিক ও প্যারাসিটামল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার ২৭ ধরনের ওষুধ এখানে মিলে। গত রবিবার টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউনিয়নের জামতলী কমিউনিটি ক্লিনিকের চিত্র এটি।
ধনবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, ১৯৯৮ সালে ক্লিনিকটি চালু হয়। যদুনাথপুর ইউনিয়নের কামদেববাড়ী দড়িবেয়ারা, কাওয়ালিয়া, পোড়াবাড়ী, মির্জাপুর, আতরামবাড়ী, ছাতারকান্দি, পাথালিয়া, বেলুটিয়া, নলহরা, কলহকুড়া ও জামতলী বাজারের ৮ হাজার ৫০০ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নেন এই ক্লিনিকে।
জামতলী বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক জানান, প্রভাবশালীরা ক্লিনিকের একপাশে গরুমহিষের খামার, অপর পাশে পুকুরের পাড় উঁচু করে। প্রবেশ পথের দুপাশে দোকানপাট থাকায় বৃষ্টির পানি ক্লিনিক চত্বর উপচিয়ে অফিসে ঢুকত। গরু-মহিষের নোংরা মলমূত্র ক্লিনিক চত্বরে জমত। বিশ্রি গন্ধে ক্লিনিকে তিষ্ঠানো যেত না। অফিস কক্ষে নোংরা পানি ঢুকে ওজন মাপার যন্ত্রসহ সবকটি সরঞ্জাম বিকল হয়ে যায়।
ইউপি সদস্য এবং ক্লিনিক পরিচালনা কমিটির সভাপতি খলিলুর রহমান জানান, দেড় বছর আগে ক্লিনিকের খুবই দুরাবস্থা ছিল। এর বেহালদশা নিয়ে ২০২০ সালের ৩০ মে দৈনিক ইত্তেফাকে ‘জামতলী কমিউনিটি ক্লিনিক বেহাল’ শিরোনামে একটি সচিত্র খবর প্রকাশের পর স্বাস্থ্য বিভাগের টনক নড়ে। তারা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় ক্লিনিকের অবকাঠামোগত সংস্কার ও বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে কিছু পদক্ষেপ নেন। ফলে ক্লিনিকের চেহারা পালটে যায়।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের ইউপি মেম্বার রাজিয়া বেগম জানান, উপজেলা হাসপাতাল দূরে অবস্থিত হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একমাত্র ভরসা এ ক্লিনিক। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মীরাও এখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য চেকআপ, পুষ্টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং জন্ময়িন্ত্রণের অস্থায়ী সামগ্রী বিতরণ করেন। এক সময়ে নোংরা পানির জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা মানুষ বিড়ম্বনার শিকার হতো। সরকার ও জনপ্রতিনিধিরা এখন ক্লিনিকে চিকিৎসার পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছেন। সব কিছু এখন ঝকঝকে তকতকে।
যদুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ফিরোজ আহমেদ জানান, ধনবাড়ী উপজেলার অধিকাংশ ক্লিনিক ব্যবহার অনুপযোগী। তবে স্থানীয় সরকারের এলজিএসপি প্রকল্পের অনুদানে যদুনাথপুর ইউনিয়নের জামতলীসহ আরো চারটি কমিউনিটি ক্লিনিকের বাউন্ডারি দেওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে গবাদি পশু প্রবেশ করতে পারে না। অবৈধ অনুপ্রবেশও বন্ধ। জামতলী ক্লিনিক চত্বরে মাটি ভরাটের পর খোয়া ঢালাই হয়। ফলে এখন জলাবদ্ধতার সুযোগ নেই। ক্লিনিকে পানি সরবরাহের জন্য বৈদ্যুতিক মোটর বসানো হয়েছে। বাথরুমে বেসিন এবং টাইলস লাগানো হয়েছে। পুরো ভবন ও বাউন্ডারি ওয়াল রং করা হয়েছে।
ক্লিনিকের কর্মী (সিএইচসিপি) আখতারুন্নাহার জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রোগীদের বসার জায়গা, কিছু আসবাবপত্র এবং জানালাদরজা মেরামতসহ অবকাঠামোগত সংস্কার হয়েছে। এক সময়ের অবহেলিত ক্লিনিকের পরিবেশ এখন খুবই সুন্দর। আগের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মাসে ৮০০ থেকে এক হাজার রোগী সেবা নিচ্ছেন।
টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম শাহাবুদ্দীন খান জানান, সরকারের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা’ এর বেসিক ইউনিট হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক। জামতলীর মতো জেলার সব পুরোনো কমিউনিটি ক্লিনিক সংস্কার এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে।
