টেলিভিশনের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার পেছনে ধর্মীয় মতবাদের ভিন্নতাকেই মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করে তদন্তে নেমেছেন গোয়েন্দারা। এই হত্যাকাণ্ডকে আগের আরো কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সাদৃশ্য রয়েছে। রাজধানীর গোপীবাগের সিক্স মার্ডারের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সাদৃশ্য রয়েছে। যদিও ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ঘটনার সময় বাড়িতে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। আজ বৃহস্পবাির র্যাব সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ধর্মীয় মতবিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, আরো কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের মিল রয়েছে। এ সব হত্যাকাণ্ডেই হত্যাকারীদের সঙ্গে নিহত ব্যক্তির যোগসূত্রতা ছিল। তারা একই কায়দায় এসব বাসায় যাতায়াত করতেন। একই স্টাইলে হত্যার আগে বাসায় প্রবেশ করে অন্যান্য বাসিন্দাদের অন্য রুমে আটকে রেখে কাপড়-চোপড় দিয়ে হাত-পা বেঁধে গলা কেটে (জবাই) ও কুপিয়ে হত্যা করেছে। কর্নেল জিয়া বলেন, হত্যাকারীরা হত্যার আলামত নষ্ট করেছে। তিনি বলেন, মিরপুরের কালশীতে ব্লগার রাজীব হায়দার শোভন ধর্মীয় মতবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় তাকে হত্যা করে জঙ্গিরা। ঠিক একই ধরনের হত্যাকাণ্ড হয় রাজধানীর গোপীবাগে। ভিন্ন ধর্মীয় মতবাদ প্রকাশ করে নিজেকে ‘ইমাম গাজ্জালী’র প্রতিনিধি দাবি করায় এই ছয় খুনের ঘটনা ঘটানো হয়।
ফারুকী খুনের ঘটনায় আলামত সংগ্রহের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে নিহতের মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে ফারুকীর মরদেহ পূর্ব রাজারবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। বাদ মাগরিব পূর্ব রাজারবাজার মসজিদ সংলগ্ন মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ফারুকীর সৌদি প্রবাসী ছেলে দেশে এসে পৌঁছাতে পারেনি। রাতের মধ্যে তার পৌঁছার কথা। এর পরই দাফনের সিদ্ধান্ত হবে বলে পরিবার জানিয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, এ ধরনের খুনের পিছনে বিভিন্ন মোটিভ থাকে। এ খুনের পিছনে যে মোটিভ রয়েছে তা খুঁজে বের করা হবে। এ ঘটনা অনভিপ্রেত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা হবে।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এরই মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন খুনিদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি গোয়েন্দা টিম মাঠে অভিযান শুরু করেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, তাড়াতাড়ি এই সব সন্দেহভাজন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জালে আটকা পড়বেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ধরতে পারলে গোপীবাগের ছয় খুনসহ অন্যান্য ধর্মীয় হত্যা রহস্য উন্মোচন করা সম্ভবপর হবে।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ফারুকী হত্যাকাণ্ডে আহলে হাদিস, শিয়া-সুন্নী মতবাদের ভিন্নমতের কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। এটাকে সামনে রেখেই আমাদের গোয়েন্দারা তদন্ত শুরু করেছে। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, শিগগিরই এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে পারবো। মহানগর পুলিশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এ হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত ও ঠাণ্ডা মাথার খুন বলে দাবি করেছেন। তারা বলেন, খুনিরা শিক্ষিত, পেশাদার ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন। তারা ঠাণ্ডা মাথার খুনি হওয়ায় খুনের পর পরই আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এরপর তারা স্বাভাবিকভাবে চলে গেছে।
নিহত ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী দাবি করেছেন, ‘ওহাবি-খারিজি-সালাফিরাই আমার বাবাকে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের মধ্যে অন্তত দুইজন দুদিন আগেও একবার আমাদের বাড়িতে আসে। খাদেমরা দুজনকে চিনতে পেরেছিল। সেদিন আসার পর আব্বা তাদের এ দিন আসতে বলেছিলেন। তাদের হাতে পিস্তল ও চাপাতি ছিল।’
ফারুকীর অনুসারী ও ঘনিষ্ঠজনেরা অভিযোগ করেছেন, ‘ফারুকী হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, ফারুকীকে পরিকল্পিতভাবেই খুন করা হয়েছে। বুধবার রাতে ফারুকীকে হত্যার পর লকার থেকে মাত্র লক্ষাধিক টাকাসহ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়। নৃশংস এ হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী মো. বেলাল হোসেনের বরাত দিয়ে তার বড় ভাই ও নিহতের ঘনিষ্ঠজন মো. জালাল হোসেন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
জালাল হোসেন বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় তার ছোট ভাই বেলাল হোসেন আরো দুই অনুসারীসহ নুরুল ইসলাম ফারুকীর বাসায় যান। রাত আটটার দিকে কয়েকজন লোক হজে যাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ করার কথা বলে ভেতরে আসেন। এর কিছুক্ষণ পরই তারা বেলাল হোসেনসহ তিনজনের হাত-পা বেঁধে মুখে গামছা ঢুকিয়ে পাশের রুমে আটকে রাখেন। এরপর তারা ফারুকীর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। নুরুল ইসলাম এ সময় এত টাকা নেই মন্তব্য করে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। আর তাতে রাজিও হয় তারা। এরপর ফারুকী লকার থেকে টাকা বের করার সময় তাকে কব্জা করে হত্যাকারীরা। পরে তাকে গলা কেটে হত্যা করে। তিনি বলেন, ‘১৯৮৫ সাল থেকে রাজাবাজার আমতলিতে থাকি। তখন থেকেই হুজুরের সঙ্গে পরিচয়।’
পুলিশের তেঁজগাও অঞ্চলের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। অপরাধী হিসেবে নয়, রহস্য উদঘাটনে তাদের সহায়তা নেয়া হচ্ছে।’ তবে নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম বলতে রাজি হননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘পুলিশ সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে হত্যারহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু করেছে। আশা করছি শিগগিরই ফল পাওয়া যাবে।’
প্রসঙ্গত, গত বুধবার রাত সোয়া নয়টার দিকে ১৭৪ নম্বর পূর্ব রাজাবাজারের ভাড়া বাড়ির দোতলায় মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত। তিনি চ্যানেল আইয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘শান্তির পথে’ ও ‘কাফেলা’ নামে দুটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন। সুন্নী মতবাদে বিশ্বাসী এই উপস্থাপক বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বাংলাদেশের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ছাড়া মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি হাইকোর্ট মাজার মসজিদের খতিব দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
ইঅ/চৌফে/শ৮০২
