নদ-নদীতে পানি বাড়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় শেরপুর সদর ও টাঙ্গাইলের নাগরপুরে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শেরপুরে পানিতে ডুবে ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া পদ্মা-মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে প্রচন্ড ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হওয়ায় চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে শহরবাসীর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। রবিবার সন্ধ্যা ছয়টায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী দেশের অন্তত ১৪ টি পয়েন্টে নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছিল।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও দশআনীতে হঠাত্ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সদর উপজেলার ৪ ইউনিয়নের ৪৫টি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে। পানিতে ডুবে ৩ জন মারা গেছেন। এরা হলেন, চর মুচারিয়া ইউনিয়নের চর ভাবনা গ্রামের কৃষক ছমেজউদ্দিন (৪০), চর শেরপুর ইউনিয়নের যুগনীবাগ খড়িয়া গ্রামের জমশেদ আলী (৫৫) এবং বলাইর চর ইউনিয়নের চর শ্রীপুর হাইস্কুলের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুর রশীদ। বর্তমানে শেরপুর- জামালপুর সড়কের পোড়ার দোকানের নিকটে ‘কজওয়ে’ দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ওই রুটে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
সদর উপজেলার বন্যা কবলিত কামার চর, চর মুচারিয়া, চর পক্ষীমারী ও বলাইর চর ঘুরে দেখা গেছে, এলাকার অধিকাংশ পাকা আউস ধান, সদ্য রোপন করা আমন জমি ও সবজি ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। কৃষকেরা জানান, ত্রাণ সামগ্রীর প্রয়োজন নেই। তাদের বীজ, চারাসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হোক। চর মুচারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম শিপন জানান, তার ইউনিয়নের ১৩টি গ্রাম বন্যা কবলিত। শনিবার বিকেলে তার ইউনিয়নের কৃষক ছমেজউদ্দিন ডুবে যাওয়া আউশ ক্ষেত থেকে ধান কেটে ফেরার পথে পানিতে ডুবে মারা গেছেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইরিন ফারজানা জানান, তিনি পানিতে ডুবে ২ জনের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছেন। উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের বিস্তৃত এলাকার ফসলের ক্ষেত ডুবে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার মোকনা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর নামক স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান কোকা জানান, শুক্রবার রাতে বাঁধটিতে ফাটল ধরে। বর্তমানে বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। এতে উপজেলার কমপক্ষে ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কয়েকশ একর জমির রোপা ধান, শাকসবজির ক্ষেত ও কলার বাগান তলিয়ে গেছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
কালিহাতী (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। দ্রুতগতিতে প্রতিটি এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। পানিবন্দি মানুষ বাড়ী ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, শহর রক্ষা বাঁধের মোলহেডে শনিবার রাতে আকস্মিক ভাঙ্গন দেখা দেয়। গতকাল পর্যন্ত বাঁধের কয়েকটি পয়েন্টে ৬০ মিটার এলাকা স্রোতের তোড়ে দেবে গেছে। এতে শহরের নতুন বাজার ও পুরান বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন রোধে জরুরি ভিত্তিতে সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ মেঘনায় নিক্ষেপ করছে। মোলহেডে দর্শনার্থীদের ভিড় এড়াতে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, জেলায় নতুন করে সারিয়াকান্দি, ধুনট ও গাবতলী উপজেলার ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যমুনার পানি ১১ সেন্টিমিটার কমলেও বিপদসীমার ৮৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকালে জেলা প্রশাসন জরুরি বৈঠক করেছে। সভায় জানানো হয়, সারিয়াকান্দি উপজেলার ১০২টি গ্রাম, ধুনটের ৩২টি ও সোনাতলা উপজেলার ২৬টি গ্রামসহ জেলার মোট ১৬০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে রৌহদহ বাঁধের যেস্থানে ৩০০ মিটার ভেঙে গিয়েছিলো সেখানে শুক্রবার ১০০ মিটার ভাঙার পর শনিবার নতুন করে আরও ১০০ মিটার ভেঙে ৫০০ মিটার এলাকা দিয়ে ভাটির দিকে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে। পানি কমার আগে সেখানে বাঁধ সংস্কার কাজ করা সম্ভব হবে না।
মেলান্দহ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে রয়েছেন। তারা গতকাল পর্যন্ত কোন ত্রাণ সামগ্রী পাননি।
ভাঙ্গুড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, বড়াল ও গুমানি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পলী্ল বিদ্যুতের লাইন পানি ছুঁই ছুঁই করায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে নৌ চলাচল।
রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের রৌমারী-রাজীবপুর সড়ক শিবেরডাঙ্গী নামক স্থানে ভেঙ্গে গেছে। এতে রৌমারী থেকে রাজীবপুর, জামালপুরসহ ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়াবহ ভাঙনে উপজেলার দুইটি গ্রামের দুই শতাধিক বাড়িঘর ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদে বিলীন হয়ে গেছে।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরি চলাচল বিঘ্নিত
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, গত ২৪ ঘন্টায় যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল রবিবার বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। প্রচন্ড স্রোতের কারণে পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজীরহাট নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বিঘ্নিত হয়।
ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, পদ্মা, যমুনা, কালিগঙ্গা, পুরাতন ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদ- নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব, ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ-ব্যাধি। এছাড়া জেলায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান, কাঁচা মরিচ ও সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।
বন্যায় কেউ না খেয়ে মরে নাই: ত্রাণমন্ত্রী
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া) গতকাল উপজেলার বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি বলেন, সরকারের ত্রাণ ভান্ডারে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কোনো মানুষ না খেয়ে মরে নাই, মরবেও না। পানি সরে যাওয়ার সাথে সাথে বন্যার্তদের জন্য ১শ’ দিনের কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে কাজের ব্যবস্থা করা হবে। পরে মন্ত্রী উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নে বানভাসিদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন।
