চাকরি-বাকরি, নিয়োগ বদলি এমনকি উন্নয়নের নথিও নড়চড় করে না তদ্বির বা সুপারিশ ছাড়া। তবে সুপারিশ বা তদ্বিরের জোরে নথির গতি বাড়ানো সম্ভব হলেও ক্ষেত্রবিশেষ তদ্বিরের ভারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রসমূহ। তদ্বিরের চাপ সামাল দিতে না পারা বা ভীতির কারণে তদ্বির এড়াতে অসংখ্য শূন্য পদের নিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে। এ সব নিয়োগ ঝুলে আছে বছরের পর পর।
সচিবালয় দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তর। এখান থেকেই উন্নয়নসহ সকল কাজের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা জারি হয়। মন্ত্রী-এমপিদের এলাকা ভিত্তিক উন্নয়ন, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিয়োগ বদলির বেশির ভাগই হয়ে থাকে এই সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভাগ থেকে। সচিবালয় ঘুরে দেখা যায়, মন্ত্রী, এমপিদের সুপারিশ ভিন্ন ব্যতিক্রম ক্ষেত্র ছাড়া কোনও কাজ হয় না। সুপারিশ করে আবার লোক লাগিয়ে রাখতে হয় কাজটি শেষ করানোর জন্য— এমন দৃষ্টান্তও ভুরি ভুরি।
রাস্তা ঘাট, কালভার্ট, বিদ্যুত্ লাইন, মসজিদ, মন্দিরের উন্নয়ন, এ সব কাজেই মন্ত্রী, এমপি কিংবা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির সুপারিশ বা তদ্বির ছাড়া হয় না।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদ্বির বা সুপারিশ আগেও ছিল এখনো আছে। কিন্তু এটি এখন মোটা দাগে এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরনের মানসিকতা বদ্ধমূল হয়েছে যে সুপারিশ না আসলে কাজ ফেলে রাখা। এর কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংশ্লিস্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালি মহলের সুপারিশ ছাড়া কোন কাজ করলে পাল্টা ধমক শুনতে হয়, অনেক সময় হয়রানির মুখেও পড়তে হয়। তবে পাল্টা অভিযোগও রয়েছে। ‘টু-পাইস’ বা সার্ভিস সার্জ পাওয়ার জন্যও নথি ফেলে রাখার অভিযোগও রয়েছে কিছু কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
আবার ভিন্ন চিত্রও লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইদানিং। মন্ত্রী, এমপির এলাকা থেকে কর্মকর্তা প্রত্যাহার বা নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে আগের রেওয়াজ এখন অনেকটাই উপেক্ষিত। আগে সাধারণভাবে এ রকম ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা এমপির মতামত নেয়া হতো এখন তাও করা হয় না। এটি স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রয়োগ বলে মন্তব্য করছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকার ভালমন্দ বিচারের ভার যতক্ষণ নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে থাকে ততক্ষণ তাদের চিন্তা-ভাবনাকেই গুরুত্ব দেয়া উচিত। তা না হলে প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির মাঝখানে অবিস্বাসের প্রাচীর তৈরি হবে, যাতে করে সামগ্রিক উন্নয়নই ব্যহত হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিনই দেশের বিভিনন্ন স্থান থেকে তদ্বির আসে। কোথাও এসি ল্যান্ড নেই, ইউএনওকে প্রত্যাহার করা দরকার, ডিসি ভালো নন, কিংবা তাদের বদলি করা হয়েছে ঠেকাতে হবে। আবার যার সুপারিশে হয়তো কোন একজনকে বদলি করা হয়েছে, তিনিই আবার সুপারিশ লিখছেন তার বদলি আদেশ বাতিল করতে। মোট কথা এক ধরনের বি্শৃংখলার নজির সর্বত্রই।
তদ্বিরে নিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কয়েকটি নজির:
২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় চার হাজার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদের নিয়োগ ঝুলে আছে মূলত তদ্বিরের চাপেই। ওয়েম্যান, গেটকিপার, খালাসি, অফিস সহকারী, এটেন্ডসসহ ছয় ধরনের ৪ হাজার পদে নিয়োগের বিপরীতে অন্তত ১০ বস্তা সুপারিশ বা তদ্বির রয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র নিশ্চিত করেছে। একাধিকবার ফলাফল ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েও তা করা সম্ভভ হয়নি। ফলাফল একাধিকবার পাল্টিয়েও সব তদ্বির সমন্বয় করতে না পারার খবরে চাপের মুখে ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখতে হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে পৌরসভার ৮০টি সচিব পদের জন্য ২০১৩ সালের জুলাই মাসে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। প্রায় ৬ হাজার প্রার্থী এতে আবেদনও করেন। যাচাই-বাছাই শেষে পরীক্ষা গ্রহণের মূহুর্তে স্থগিত করা এ নিয়োগ প্রক্রিয়া। আজ অবধি নতুন করে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। একই বিভাগের কম্পিউটার অপরাটেরের ১৩টি পদে ৫০০ প্রার্থীর নিয়োগ পরীক্ষাও বন্ধ গত বছরের জুলাই মাস থেকে।
বিগত বছরের অক্টোবর নভেম্বরে আন্দোলনের কথা বলে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে-স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এমন দাবি মানতে রাজি হননি অনেকেই। একজন ঊধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অন্যয্য তদ্বিরের চাপ সামলানো সম্ভব হবে না বলে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এখানকার কেউ ঝুঁকি নিয়ে কারো বিরাগভাজন হতে চান না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহকারী পদের নিয়োগ আটকে আছে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে। পরিসংখ্যান সহকারীর ৬৫টি গত ১৪ ফেরুয়ারি পরীক্ষা শেষ হলেও নিয়োগ হয়নি এখনো। আনসার ও ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সহকারী অফিসার পদে পরীক্ষা শেষ হয় গত ২৩ ফেরুয়ারি, ফলাফল ঘোষণা এখনো হয়নি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিপ্তরের অফিস সহকারী পদে ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হয় ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টম্বর। বাকি খবর হয়নি এখনো।
উল্লেখ্য, সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগের বিধান থাকলেও কি প্রক্রিয়ায় নিয়োগ করা হবে তার কোনো বিধান নেই। তাই সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যে যেভাবে নির্ধারণ করেন সেভাবেই নিয়োগ হয়। তাই কেউ মৌখিক, কেউ লিখিত পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। অবশ্য জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অর্থ ও তদবিরই হয়ে উঠছে এ সব চাকরির একমাত্র নিয়ামক। আর এ সুযোগে ‘উপরি আয়’-এর সম্ভাবনার ভিত্তিতে চাকরির প্রতিশ্রুত মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে খোলাখুলিভাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তব্দিরে ব্যস্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে এমপি আর প্রভাবশালী মহল। আর এদের সকলের চাপের মুখে অসহায় নিয়োগ কমিটি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে লোক দেখানো নিয়োগ পরীক্ষা (মৌখিক বা লিখিত) নেওয়া হচ্ছে। শেষ বিচারে সুপারিশের প্রার্থীরাই নিয়োগ পাবেন, কিন্তু আর্থিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়ে প্রতারিত হবেন লাখ লাখ বেকার যুবক। একটি আবেদন করতে কমপক্ষে ২০০ টাকা খরচ হয় বলে চাকরি প্রার্থীরা জানিয়েছেন। আর দীর্ঘ দিন নিয়োগ ঝুলে থাকার কারণে অনেকের চাকরির বয়সও চলে যাচ্ছে।
ইঅ/চৌফে/শ৭৯০
