বহুমুখী দুর্ভোগে পানিবন্দী মানুষ

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ২১:৫৯
 
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দী মানুষদের। যারা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা এখন ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে দুর্ভোগ তাদের পিছু ছাড়ছে না। ঘরে খাবার নেই, কাজ নেই। পানিবাহিত নানা অসুখে ভুগছে পরিবারের কেউ না কেউ। ঘরবাড়ি ভেঙ্গে যাওয়ায় অনেকে খোলা আকাশের নিচে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়িঘর মেরামত ও বিনষ্ট ফসলের পরিচর্যার জন্য টাকার যোগান নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে বহু বানভাসি পরিবার। এর উপর বন্যাদুর্গত এলাকাসমূহে ডায়রিয়াসহ নানা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বেড়েছে সাপের উপদ্রব। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে সাপের দংশনে এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, বুধবার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে বানভাসিদের দুর্ভোগ কাটেনি। সরকারের দেয়া কিছু চাল ও নগদ অর্থ ত্রাণ হিসেবে মিললেও কাজের অভাবে মানবেতর জীবন কাটছে অসহায় খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর। বানের কারণে এলাকায় কোন কাজ মিলছে না। অনেকের আর্তি: ত্রাণ চাই না, কাজ চাই। এদিকে তিস্তাপাড়ের বন্যাদুর্গতদের মাঝে স্থানীয় এনজিওগুলো ত্রাণ বিতরণ না করায় এসব এনজিওর উপকারভোগীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। 
উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ছাতনাই গ্রামের আব্দুল মজিদের পুত্র আকবর আলী (৩৫) জানান, বন্যার কারণে ফসল নষ্ট হওযায় এলাকায় কাজের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।  একই গ্রামের ছাইত আলীর পুত্র আবু তাহের জানান, খাদ্য সংকটের পাশাপাশি কাজের সংকটে চরম বিপাকে পড়েছে মানুষ। এসব এলাকায় সরকারি ভাবে কাজ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নীলফামারীর জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন। 
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভাগ্যকুল পয়েন্টে পদ্মার পানি আরও ১৯ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে  সকাল ৬ টায় বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছিল। জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও কয়েক হাজার মানুষ রয়েছেন দুর্ভোগে। বন্যাদুর্গত এলাকায় নানা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। সিরাজদিখানের রাজদিয়ায় সাপের কামড়ে সুমনা দাস (৭) নামের এক শিশু মারা গেছে এবং শাহানারা বেগম (৪৫) নামের এক নারী আহত হয়েছে। এদিকে লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ও মাওয়া এবং টঙ্গীবাড়ি উপজেলার কামারখাড়ায় পদ্মার ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের সমস্যা লাঘবে প্রশাসন সর্বাত্নক চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পানি কমতে থাকায় দুর্গত এলাকায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সিভিল সার্জন ডা. কাজী শরিফুল আলম জানিয়েছেন, মেডিক্যাল টিম দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত ওষুধ নিয়ে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।  বন্যাবাহিত রোগ এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচে নেমে যাওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বেশিরভাগ এলাকার মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে চরাঞ্চলের নিচু এলাকাগুলো এখনও পানিতে ডুবে থাকায় সেসব এলাকার লোকজন এখনও ঘরে ফিরেন নি। তাছাড়া ঘরে খাবার না থাকায় কর্মহীন বন্যার্ত মানুষরা বিপাকে পড়েছেন। এখনও জেগে উঠেনি বন্যা কবলিত এলাকার রাস্তা-ঘাট। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্যাম্পে দেড় শতাধিক ডায়রিয়া রোগীকে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বন্যার পানি নেমে যেতে শুরু করায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি এবং সদর উপজেলার ১৩টি পয়েন্টে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় গত দু’দিনে দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
মেলান্দহ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের মেলান্দহে বন্যার পানি কমতে শুরু হয়েছে। তবে মঙ্গলবার রাতে দুস্কৃতিকারীরা ব্রহ্মপুত্র নদের বেড়িবাঁধ খ্যাত টুপকাপরচর রাস্তাটি কেটে দিয়েছে। ফলে হাজার হাজার একর জমি নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করায় চৌহালী ও এনায়েতপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে এগুচ্ছে। তবে পানি কমায় নদীতে প্রচন্ড স্রোতে বেড়েছে ভাঙ্গন। চৌহালী উপজেলা পরিষদের সকল স্থাপনা গ্রাস হওয়ার পর সন্ধ্যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির বাদ-বাকি স্থাপনাও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পুরো উপজেলাজুড়ে চলছে নদী ভাঙ্গা মানুষের হাহাকার ।
দৌলতপুর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনা, ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা  নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও উপজেলার বহু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। যমুনা নদীর চরাঞ্চলের ২২ গ্রামের বাড়িঘর কোমর থেকে হাঁটু পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শত শত মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিশুদ্ধ পানি ও লাকড়ির অভাবে রান্না করতে পারছেন না তারা। এলাকায় দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ।
চরাঞ্চলের এক পানিবন্দী গৃহিনী জোছনা প্রামাণিক জানান, ‘গত ১৫ দিন ধইর্যা বাড়ি ঘরে পানি উঠছে। দ্যাহার জইন্যে কেই আহে নাই।’ ঘিওরের জোকা এলাকার বানভাসীদের ছবি তুলতে গেলে নাজমা আক্তার নামের এক গৃহবধূ জানান, ‘ছবি তুইল্যা আমাগো লাভ কি। এতে চেয়ারম্যান-মেম্বারগো পেট ভরবো।’
রংপুর প্রতিনিধি জানান, পানি কমে যাওয়ায় ভাঙ্গনের কারণে গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকার ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিস্তায় বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী সমাধান, ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা, কৃষি ও মত্স্যজীবীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ বিভিন্ন দাবিতে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ইতিমধ্যে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় যে নগদ টাকা ও চাউল বিতরণ করা হয়েছে তা অপর্যাপ্ত বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।