রাজধানীর পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা বিষ্ফোরক আইনের মামলায় হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। একই সঙ্গে আগামী ২৩ অক্টোবর এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. ইমরুল কায়েস আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এই আদেশ দেন। মামলার ১৩ আসামির মধ্যে মুফতি হান্নানসহ পাঁচজন কারাগারে এবং অপর আট আসামি পলাতক রয়েছেন। মামলা দায়েরের সাড়ে ১৩ বছর পর হত্যা মামলার পর বিস্ফোরক মামলায়ও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলো। এই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে চাঞ্চ্যলকর এ মামলার বিচার শুরু হলো বলে জানান আইনজীবীরা।এ দিকে এই বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গত ২১ আগষ্ট একই আদালত ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর এ হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি রাজধানীর পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন এবং পরে একজন হাসপাতালে মারা যান। ওই ঘটনায় সিপিবির তত্কালীন সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করার দুই বছর পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন। তিনি আদালতকে বলেন, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে ২০০৫ সালে আবার মামলাটির তদন্ত শুরু হয়। সাত তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে অবশেষে গত বছর নভেম্বরে অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়ে। মামলা দায়েরের ১৩ বছর পর গত বছর ২৭ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা ১৩ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন। দণ্ডবিধির ৩২৪/৩২৬/৩২৭/৩০২/১২০ (বি)/৩৪ ধারায় হত্যা মামলার এবং বিষ্ফোরক দ্রব্য আইনের ৪, ৫ ও ৬ ধারায় বিস্ফোরক মামলার পৃথক দু’টি অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আসামিদের মধ্যে মাইনুদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মঈন উদ্দীন জবানবন্দিতে বলেন, তিনি মুফতি হান্নানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মাওলানা আবদুস সালাম, মাওলানা আবদুল হাই, শফিকুর রহমান, শেখ ফরিদ, জাহাঙ্গীর বদর ওরফে আবু জান্দাল প্রমুখ জঙ্গিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি হরকাতুল জিহাদের কার্যালয়ে গেলে তিনি জানতে পারেন, পরের দিন অর্থাত্ ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির জনসভা আছে। সেখানেই সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার সিদ্ধান্ত হয়।
আজ বিস্ফোরক এ মামলার অভিযোগ গঠনের জন্য দিন ধার্য ছিলো। ধার্যকৃত দিনে মুফতি হান্নান (রমনা বটমূল বোমা হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত), মাইনুদ্দিন শেখ, মাওলানা সাব্বির, শওকত ওসমান ও মশিউর রহমানকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। আসামিদের উপস্থিতিতে ঢাকার তৃতীয় মহানগর দায়রা জজ অভিযোগ গঠনের পূর্বে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে শোনান। উপস্থিত আসামিরা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে আসামিদেরকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য তাদের আইনজীবীরা আদালতে আবেদন জানান। বিচারক অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দিয়ে ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ১৩ আসামির মধ্যে আব্দুল হাই, শফিকুর রহমান, নুর ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মুহিবুল্লাহ মুত্তাকীন, আনিসুল ইসলাম মোরসালীন, রফিকুল ইসলাম মিরাজ পলাতক রয়েছেন। একমাত্র আসামি আরিফ হাসান সুমন জামিনে থেকে আদালতে হাজির ছিলেন। তবে এ মামলায় জামিনে থাকলেও রমনা বটমুলে বোমা হামলার মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশ হওয়ায় মুফতি হান্নানকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, এ হামলার মুল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মুফতি শফিকুর রহমান। টাইম বোমা বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় মুফতি আবদুল হান্নানকে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু আসামিরা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে সিপিবি নেতাদেরকে ‘কাফের’ আখ্যায়িত করেন। আর তাদের নিশ্চিহ্ন করাই ছিল হামলার মুল উদ্দেশ্য।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের পল্টন ময়দানে সিপিবির ডাকা এ লাল পতাকার সমাবেশে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। ওই মঞ্চে ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর তত্কালীন সভাপতি সৈয়দ হাসান ইমাম, কমিউনিস্ট পার্টির তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ছিলেন।
এ হামলায় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আবদুল মজিদ, ঢাকার ডেমরা থানার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাশেম ও মাদারীপুরের মুক্তার হোসেন ঘটনাস্থলেই এবং খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাস আহত হয়ে ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মারা যান। বোমা হামলায় আহত হন সিপিবির শতাধিক কর্মী।
ইঅ/চৌফে/শ৬৭১
