ঢাকায় বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক

সহযোগিতার নতুন যুগ শুরু হল :জাপানি প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১০:১৫

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে জাপানের সমর্থনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৬-২০১৭ মেয়াদে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপ থেকে বাংলাদেশ ও জাপান নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে প্রার্থী ছিল। জাপানের সফররত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ উদারতায় গভীর কৃতজ্ঞতা জানান জাপানি প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গতকাল শনিবার বিকালে প্রায় এক ঘন্টা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার এই ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ঢাকা ও টোকিও সম্পর্ক আরো সমন্বিত ও বলিষ্ঠ অংশীদায়িত্ব পর্যায়ে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ২০১৪ সালটি আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই বছরে আমরা দুই প্রধানমন্ত্রী একে অপরের দেশ সফর করি। আমরা সহযোগিতা আর অংশীদারিত্বের নতুন যুগে প্রবেশ করলাম।
জাপান আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু :শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্যে বলেন, আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জাপানের অব্যাহত জোরদার সমর্থন রয়েছে। সে জন্যই নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনে আমরা জাপানকে সমর্থন দেব। বাংলাদেশও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে। এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্যের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৯৯-২০০০ মেয়াদে বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে বিজয়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কয়েক বছর আগে আবার আমরা প্রার্থিতা ঘোষণা করি। জাপানও একই গ্রুপ থেকে প্রার্থী হয়। জাপান সরকার ও সেদেশের জনগণ আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। ৪৩ বছরে জাপান ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে আরও ছয় বিলিয়ন ডলার দেবে।
তিনি বলেন, আশাকরি জাপানের প্রতিশ্রুতি কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। গত মে মাসে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সকল ক্ষেত্রকে সম্প্রসারণ ও সুদৃঢ় করতে আমরা সমন্বিত অংশীদারিত্ব কর্মসূচি উদ্বোধন করেছি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের জন্য সহায়তা দিতে জাপান বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট-বিগ বি কর্মসূচি উদ্বোধন করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, জাপানের নির্মাণ শিল্প, স্বাস্থ্য ও নার্সিং খাতে আমরা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি স্থাপন কার্যক্রমে জাপান সবসময়ই সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ঢাকায় একটি শান্তিরক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলতে জাপান কারিগরি সহায়তা দেবে।
আমি অভিভূত :শিনজো আবে
জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদারতায় আমি অভিভূত। আমি ও জাপানের জনগণ এই সিদ্ধান্তের অত্যন্ত প্রশংসা করি। এই সিদ্ধান্ত দু’দেশের বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। জাপান বাংলাদেশকে আগামী দিনে সহায়তা দিয়ে যাবে। আগামীতে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারেও বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে জাপান।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৪-৫ বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেয়া হবে। ইতিমধ্যে মে মাসে এক দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে দুই প্রধানমন্ত্রী প্রায় আধ ঘণ্টা একান্ত বৈঠক করেন। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দুটি অ্যালবাম উপহার দেন। শিগগিরই জাপানকে দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার উপহার হিসেবে পাঠাবে বাংলাদেশ।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের স্মারক মুদ্রা সম্বলিত স্মারক উপহার দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। মুদ্রার একদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
লালগালিচা সংবর্ধনা
জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ও তার স্ত্রী আকি আবে দুপুরে ঢাকা এসে পৌঁছালে তাদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী, তার স্ত্রী ও তাদের সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিশেষ বিমানটি বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ভিভিআইপি টারমাকে পৌঁছালে শিনজো আবে ও তার স্ত্রী আকি আবেকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় দু’টি শিশু তাদের ফুলের তোড়া উপহার দেয়।
তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল শিনজো আবেকে গার্ড-অব-অনার এবং রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়। সুসজ্জিত মঞ্চে শেখ হাসিনাকে সাথে নিয়ে আবে সালাম গ্রহণ করেন। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। পরে উভয় প্রধানমন্ত্রী গার্ড পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত মন্ত্রিসভার সদস্য ও অন্য উচ্চপদস্থদের সঙ্গে শিনজো আবেকে পরিচয় করিয়ে দেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীও তার সফর সঙ্গীদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন।
জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে আরো উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভূইয়া, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, তিন বাহিনী প্রধানগণ, পুলিশের মহাপরিদর্শক, কূটনৈতিক কোরের প্রধানসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন
বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা শেষে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সোজা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান এবং পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি সেখানে পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন। পরে শিনজো আবে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং সেখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বাংলাদেশ সফরকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অবস্থান করছেন। এরপর তিনি দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তৃতা করেন। পরে বিকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক করেন। রাতে শেখ হাসিনা জাপানী প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন।
শিনজো আবে ১৫০ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এদের ৫০ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা। আজ সফরের শেষদিনে তিনি সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে যাবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় শ্রীলঙ্কার উদ্দেশে তার ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে
সহায়তা করবে জাপান
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে এদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তিনি বলেন, অবকাঠামোর উন্নতি করে বিনিয়োগে ভালো পরিবেশ গড়ে তুলতে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়।
গতকাল একটি হোটেলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের সহ-আয়োজক ছিলো বিনিয়োগ বোর্ড ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রধান তিনটি খাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। এগুলো হলো, বিদ্যুত্ ও জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ; নগর উন্নয়ন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বেসরকারি খাতের উন্নয়ন। তিনি বলেন, আমি আশা করি এ তিন খাতে জাপানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দে  জাপানি বিনিয়োগ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, ২০১৪ সাল দুদেশের জন্য স্মরণীয় বছর হয়ে থাকবে। এ সময়কালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করেছেন এবং আমিও এ দেশ সফর করছি। আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন উচ্চতায় প্রবেশ করেছি। আমরা দুদেশ যে সহযোগিতায় যাচ্ছি তা ভাই-বোনের মতো। এ সম্পর্ক উন্নয়নে দুদেশের ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা বড় ভূমিকা পালন করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিনজো আবে বলেন, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ, সেই উদ্যোগকে জাপান স্বাগত জানায়। বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান। এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, ব্যবসায়ী মীর নাসির হোসেন, শওকত হোসেনও বক্তব্য রাখেন। এছাড়া বিজনেস অধিবেশনে বাংলাদেশের দুজন ও জাপানের আটজন ব্যবসায়ী উভয় দেশের পণ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন।
জাপানী প্রধানমন্ত্রী গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন।