তিন হাজার সরকারি চাকুরের অবসর ভাতা স্থগিত হচ্ছে

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১০:২২

প্রায় তিন হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবসর ভাতা (পেনশন) স্থগিত রাখা হচ্ছে। চাকরিতে আবেদনের সময় নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা না করে অবসরের বয়স বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত এক বছর চাকরিতে থাকার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, দুইজন উপসচিবসহ ১৮২ জনের ভাতা স্থগিত করা হয়েছে। সিভিল অডিট অধিদপ্তরে এ বিষয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে। তবে যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে এক বছর চাকরি করেছেন সেই এক বছরে গ্রহণ করা টাকা কেটে নিয়ে বাকি টাকা তাদের প্রদান করার সুপারিশ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে ।  

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গত রবিবার ইত্তেফাককে জানান, মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল বলে প্রমাণিত ১৮২ জনের তালিকা সিভিল অডিট অধিদপ্তরকে দেয়া হয়েছে। বাকিগুলো যাচাই-বাছাই শেষে  পাঠানো হবে। তিনি আরো জানান, যেসব কর্মকর্তা চাকরিতে যোগ দেয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নিজেদের ঘোষণা করেননি তারা তথ্য গোপনের কারণে অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে যাদের চাকরিতে আত্মীকরণ করা হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মীকৃতদের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণার কোন সুযোগ ছিল না।

২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেয়া বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যখন হয়েছে তখন তারা স্বীকার করেছেন যে চাকরি গ্রহণকালে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা করেননি। কিন্তু বিধান অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে তাদের প্রত্যায়ন করা হয়েছে। এই প্রত্যায়নের ভিত্তিতেই তারা অতিরিক্ত এক বছর চাকরি করছেন বা করেছেন। এ সময় তারা শ্রমও দিয়েছেন। এখন কোন আইনের ভিত্তিতে সরকার টাকা কেটে নেবে বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে? এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও সরকার দায় এড়াতে পারে না।
একজন মুক্তিযোদ্ধা খেদের সঙ্গে বলেন, আর কী উপায়ে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর অধীনে দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নেয়া এই গণকর্মচারী মুক্তিযোদ্ধা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সনদ, স্থানীয় কমান্ডারের প্রত্যায়ন, সর্বোপরি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যায়ন- সবকিছুকেই ভুয়া বলে কী মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হচ্ছে না ?

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান দু:খ করে বলেন, তিনি ২০১১ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ২০১৩ সালে বেসরকারি নাগরিক হিসাবে তিনি সনদ নিয়েছেন। অথচ নানাভাবে তাকেও হেনস্থা করার চেষ্টা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী আইন’ সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের অবসরের বয়স দুই বছর বৃদ্ধি করে। এ সময় গণকর্মচারীদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সনদ জোগাড়ের হিড়িক পড়ে যায়। চাকরিকালে ঘোষণা না দিলেও এ সময়ে এসে অনেকে রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা বনে যান। বাগিয়ে নেন মুক্তিযোদ্ধার সনদ। আর সুযোগ নেন বাড়তি চাকরির সুবিধা। তবে পরে সব শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীর চাকরির বয়স এক বছর করে বাড়ানো হয়।

২০১০ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি পরিপত্রে চারটি শর্ত মেনে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীর বয়স বৃদ্ধি কার্যকর করার কথা বলা হয়। এসব শর্ত হচ্ছে যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন অথবা যাদের নাম মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত হয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশ হয়েছিল অথবা যাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সই করা সনদ রয়েছে।

পরে মুক্তিযোদ্ধার সনদ জোগাড়ের হিড়িক এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে জাতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে জানতে পারে যে অসংখ্য অমুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারী ভুল ও অসত্য তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্ত হচ্ছেন এবং বয়স বৃদ্ধির সুযোগ নিচ্ছেন। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ২২ জুন বিষয়টি সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়।

তবে উল্লেখ করা যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একক সিদ্ধান্তে কোন সনদ ইস্যু বা বাতিল করতে পারে না। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই শেষে সনদ দেয়া না দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের চেয়ারম্যানসহ ৮ জন এমপির মধ্যে চারজন এখন মন্ত্রী। তারা সে সময় কীভাবে মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রত্যায়ন করেছিলেন সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
এক পর্যায়ে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত হন আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি। তিনি গণকর্মচারী ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়েও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অনুসন্ধান শুরু করেন। ইতিমধ্যে ১৮২ জন অমুক্তিযোদ্ধার মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নেয়া সনদ বাতিল করেছেন।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গণকর্মচারীদের মধ্যে থেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিতে এবার মন্ত্রণালয় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসাবে যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা দেননি তাদের অবসরের বয়স বৃদ্ধির সুযোগও বাতিল করা শুরু হয়েছে।

মন্ত্রণালয় বলছে, মুক্তিযোদ্ধার সনদ যাচাই-বাছাই করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রত্যায়ন দেয়ার পরই কেবল কেউ মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারী হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, করপোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নিজেরাই মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অনেককে চিহ্নিত করে বাড়তি চাকরির সুযোগ করে দিচ্ছেন। এ ধরনের সুযোগ যারা নিয়েছেন অবিলম্বে তাদের সুযোগ-সুবিধা বাতিলের চিঠি দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে। এসব প্রতিষ্ঠান এখন অতিরিক্ত সময় চাকরি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিকট চিঠি পাঠাচ্ছে।