শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় চিরবিদায় জানানো হলো নজরুল সাধক শিল্পী ফিরোজা বেগমকে। আজ বুধবার সর্বস্তরের মানুসের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গুলশান আজাদ মসজিদে মরহুমার নামাজে জানাযা হয়। এরপর সন্ধ্যায় বনানি কবরস্থানে স্বামীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
আজ কিংবদন্তিতুল্য নজরুলসংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগমের মরদেহ শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। এ শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল নামে। দুপুর ২টা থেকে এ শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। এর আগে দেড়টার দিকে শিল্পীর মরদেহ ইন্দিরা রোডের বাসভবন শহীদ মিনারে আনা হয়। এ সময় লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে মেঝ ছেলে হামিন আহমেদ এবং ছোট ছেলে শাফিন আহমেদসহ নিকটাত্মীয়রাও সেখানে আসেন। এ দিকে শিল্পীর বড় ছেলে তাহসিন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তিনি। তবে তার জন্য অপেক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবারের সদস্যরা।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলির জন্য দুপুর সোয়া একটায় তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান গগণ শিরিষের তলে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে সর্ব ধরণে আয়োজন সম্পন্ন করে অপেক্ষা করছিলেন জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ প্রাঙ্গণে। শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে আগে থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অপেক্ষারত ছিলেন তার ভক্তরা। দুপুর দুইটায় শুরু হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব। এর আগে কফিন বহন করে আসেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফের নেতৃত্বে সংস্কৃতিকর্মীরা।
শ্রদ্ধাঞ্জলির শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মরহুমের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ, সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শিখর, সামরিক সচিব কর্নেল মাহবুব। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, মহিলা ও শিশু প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেনসহ দলে বেশকয়েক নেতৃবৃন্দ। বিএনপির পক্ষে ড. মঈন খান, ডা. জাহিদ হোসেন, খায়রুল কবির খোকন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, নায়ক উজ্জ্বল, হেলাল খান, কণ্ঠশিল্পী মনির খান প্রমুখ। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ও সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শিরিন আখতার, ছায়ানটের পক্ষে খায়রুল আনাম শাকিল। ব্যক্তিপর্যায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ইমেরিটাস প্রফেসর আনুিসজ্জামান, ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, ব্যারিস্টার রফিক উল হক, হাশেম খান, রামেন্দু মজুমদার, জনপ্রশাসন সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, সংস্কৃতিসচিব ড. রণজিত্ কুমার বিশ্বাস, রাশেদা কে চৌধুরী, মনসুর মূসা, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খালিদ হোসেন, আবদুল জব্বার, সালাউদ্দিন আহমেদ, সুজিত মোস্তফা, আইয়ুব বাচ্চু, আফরোজা বানু, শাহীন সামাদ, পাপিয়া সারোয়ার, খিলখিল কাজী, লাইসা আহমেদ লিসা, ইয়াকুব আলী খান, শহীদুল্লাহ ফরায়জী প্রমুখ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করে নজরুল ইন্সটিটিউট, নজরুল একাডেমি, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চা কেন্দ্র, সাম্যবাদী দল, সোনারগাঁও জাদুঘর, বিএমএ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, উদীচী, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী, কারক, বাসদ, জাসদ, জাসাস, কর্মজীবী নারী, মহিলা পরিষদ, সংস্কৃতি বিকাশ চর্চা কেন্দ্র, নৃত্যশিল্পী সংস্থা, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, গ্রাম থিয়েটার, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, প্রতিধ্বনি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, বামবা, ঋষিজ, পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি), সাংস্কৃতি ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, লেবার পার্টি, লেজার ভিশন, এটিএন বাংলা, আরটিভি, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, গান বাংলা টেলিভিশন, গণফোরাম, বিশ্ব কবিতা পরিষদ, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, কণ্ঠশীলন, প্রজন্ম একাত্তর, আর্কাইভ ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন, ভিন্নধারা, প্রকাশ আবৃত্তি সংগঠন, প্রতিসৃষ্টি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জাতীয় নারী জোট, জাসদ ছাত্রলীগ, রাইজিং বিডি ডট কম, ঢাকা ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, দেশ নাটক, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আওয়ামী উলামা লীগসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দল।
শ্রদ্ধা জানিয়ে শহীদ মিনারে নীরবতা পালন:
নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব শেষ হয় এক মিনিট নীরবতার মধ্য দিয়ে। এর আগে সমগ্র শিল্পী সমাজের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তিনি বলেন একটি শতাব্দিতে একজন ফিরোজা বেগমের জন্ম হয়, প্রতি শতাব্দিতে এমন ফিরোজা বেগমের জন্ম হয় না। তিনি দেহ ত্যাগ করেছেন, লোকান্তরিত এটা সত্য। কিন্তু তার সৃষ্টকর্ম, তার স্মৃতি অবিনশ্বর হয়ে থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবুল মুহিত বলেন ‘মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন একজন চমত্কার গুণের অধিকারী’। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘তার জীবনের পুরোটা সময় সবই ছিল সঙ্গীতকে ঘিরে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, এটা কত বড় ক্ষতি তা বলার অপেক্ষ রাখে না। ইমেরিটাস প্রফেসর আনিসুজ্জমান বলেন, ‘উনি একজন বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। তার জীবনাদর্শকে অনুস্মরণ করে আমাদের চলতে হবে। তিনি চলে যাওয়ায় কতটুকু শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। সময় বলে দিবে যে তার চলে যাওয়া কত ক্ষতি হলো।’
ফিরোজা বেগমের ভাই আসফদ্দৌলা বলেন ‘তিনি চলে যাওয়াতে শুধু আমাদের পরিবার নয়, বাঙালি জাতির পরম ক্ষতি হলো’। শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘তার গায়কী ও সুন্দর চিন্তাকে লালন করা উচিত। প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের উচিত তার সঙ্গীতজীবনের ভালো দিকগুলোকে অনুসরণ করে শুদ্ধ চর্চায় এগিয়ে যেতে হবে। লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘ফিরোজা বেগম রবীন্দ্রনাথের গানসহ বিভিন্ন শিল্পীর গান চর্চা করেছেন। তবে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে নজরুলের গানই তার আসল ঠিকানা। তার এই সিদ্ধান্ত বাঙালি সংস্কৃতির পরম পাওয়া। যদি তার বিশুদ্ধ গায়কীর সূত্র ধরে কেউ লালন না করে তবে এটা হবে নজরুলের আরেক মৃত্যু। কাজী নজরুল ইসলামের নাতনী খিলখিল কাজী বলেন,‘ দাদুকে হারানোর মতো সমান ব্যাথ্যা পাচ্ছি আজ ফিরোজা বেগমের মৃত্যুতে। তিনি প্রথমে দাদুর গানে যেভাবে মগ্ন ছিলেন যেভাবে গানকে অবিকৃতভাবে গেয়েছেন ও প্রচার করেছেন তার পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।’
খায়রুল আনাম শাকিল বলেন, ফিরোজা বেগম চলে গেলেন সেই স্থানে আরেক জন শিল্পী তৈরি হতে পারবে কী না সে বিষয়ে সংশয় আছে। তার মৃত্যু শুধু নজরুল সংগীতাঙ্গনে নয় সমগ্র সংগীতাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি। সুজিত মোস্তফা বলেন, ‘সঙ্গীতের বোধ, সমকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সহজেই অনুমেয় হবে তিনি সঙ্গীতের কত বড় শিল্পী তথা মানুষ ছিলেন।
ইঅ/চৌফে/শ৯১৬
