চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষকদের বহনকারী বাসে ককটেল হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩ শিক্ষকসহ ১৬ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার সকাল সোয়া ১০টায় চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের নন্দীরহাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, সিএনজি অটোরিকশা আরোহী কয়েকজন যুবক বাসে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা ৫ জনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। আটককৃতরা হলেন, আকতারুজ্জামান, সাব্বির হাওলাদার, ইউসুফ, ইমরান আলী ও তৌহিদ। হাটহাজারী থানা পুলিশ জানায়, আটককৃতরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শিক্ষক বাসে হামলার জন্য ছাত্রশিবিরকে দায়ী করেছে পুলিশ।
আহত শিক্ষকরা হলেন- বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার সাইদ, মার্কেটিং স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী, রসায়ন বিভাগের সভাপতি ড. সৈয়দা হালিমা বেগম, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ, নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান অশ্রু, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক রওশন আরা, পালি বিভাগের প্রভাষক সুদীপ্তা বড়ুয়া, সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক ফাতেমা তুজ জোহরা, ফলিত পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক সাবরিনা আলম, প্রাণরসায়ন বিভাগের প্রভাষক সোনম আক্তার, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক শিরীন আরা চৌধুরী। এছাড়া হিসাব বিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী আনিকা নাগ, বাস চালক আজিজুল হক ও মাহবুব আলম আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহীদুল গণি জানান, আহত অবস্থায় মোট নয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে আনা হয়। এর মধ্যে একজন জরুরি বিভাগে চিকিত্সা নিয়ে বাসায় চলে যান। ককটেলের বিকট শব্দে চারজনের শ্রবণেন্দ্রীয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিত্সা শেষে তারা বাড়ি চলে যান। তবে বাকী চারজনের আঘাত কিছুটা গুরুতর। তাদের হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ককটেলের স্প্লিন্টার ঢুকেছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্প্লিন্টার অপসারণ করা হলেও সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হাসপাতালে রাখা হবে। আহতদের সকলের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে জানান তিনি।
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ইত্তেফাককে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ডাকে গত দশদিন ধরে লাগাতার ধর্মঘট চলছে। তাই বাসে হামলার ঘটনায় শিবির জড়িত বলে ধারণা করছি।
এদিকে আহত শিক্ষকরা বাসের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন। আহত শিক্ষক তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ সাংবাদিকদের জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়ায় আমরা ক্যাম্পাসে আসতে রাজি হয়েছি। পুলিশ প্রহরায় শিক্ষক বাস আসার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি।
এ বিষয়ে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল বলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় শহর থেকে ছেড়ে আসা দু’টি বাসে আমরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। তবে সাড়ে নয়টার দু’টি বাসের জন্য সেভাবে পুলিশ প্রহরা ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম রাস্তায় লোকজনের উপস্থিতি বেশি থাকলে কেউ বিশৃঙ্খলা করার সাহস পাবে না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট সভা হওয়ার দিন নির্ধারিত ছিল। সিন্ডিকেট সভা পন্ড করার উদ্দেশে হামলা চালানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজিম আরিফ সিন্ডিকেট মিটিং শেষে সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ প্রশাসনকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছি। ক্যাম্পাসে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোন সংগঠন নিষিদ্ধ করা সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এদিকে, হামলার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও প্রগতিশীল ছাত্রজোট।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি বেনু কুমার দে হামলাকারীদের গ্রেফতার ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধের দাবি জানান। প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির-ছাত্রলীগের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনার জেরে সোহরাওয়ার্দী হল বন্ধ করে দেন কর্তৃপক্ষ। এর আগে ১২ জানুয়ারি শিবির-ছাত্রলীগ সংঘর্ষের কারণে বন্ধ করে দেয়া হয় শাহ আমানত হল। বন্ধ হলগুলো খুলে দেয়ার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে গত ৩১ আগস্ট থেকে ক্যাম্পাসে অবরোধের ডাক দেয় ছাত্রশিবির। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বহনকারী ট্রেন ও শিক্ষকদের বাসে বেশ কয়েকবার হামলা চালায় শিবির। তবে এতে তেমন কেউ আহত হয়নি।
