কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক (অর্থকড়ি ফসল) আবদুল মালেক পরিবার নিয়ে থাকেন তেজতুরী বাজার। প্রতিদিন প্রাতভ্রমণ শেষে কারওয়ান বাজার মাছের আড়তের পাশে রেললাইনের উপর বসা বাজার থেকে সবজি ও মাছ কিনে বাসায় ফেরেন। অন্য দিনের মতো বৃহস্পতিবারও সকালে তিনি প্রাতভ্রমণ শেষে বাজার করতে যান। দামাদামি করে কিনেছেনও কিছু সবজি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় মালেকের মতো ক্রেতা-বিক্রেতারা পাশের লাইনের উপর দাঁড়ান।
এ সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া কর্ণফুলি এক্সপ্রেস সেখানে পৌঁছালে দুই ট্রেনের মাঝে পড়েন তারা। এতে ঘটনাস্থলেই একজন মারা যান। পরে হাসপাতালে মালেকসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আরো ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শুধু আবদুল মালেক (৬০) নয়, গৃহবধূ মনোয়ার বেগমও (৫০) বাংলামটর থেকে মাছ ও কাঁচাবাজার করতে ওই রেললাইনের উপর গিয়েছিলেন। মনোয়ারার স্বামী কাওসার হাওলাদার ইত্তেফাককে বলেন, কারওয়ান বাজারের ওই কাঁচাবাজারে সব সবজির দাম তুলনামূলক কম। পাশেই সবজির বড় আড়ত্ থাকায় প্রচুর সবজি পাওয়া যায়। তাই আশপাশের এলাকার লোকজন সেখান বাজার করতে যান। মনোয়ারাও বাজার করতে সেখানে গিয়েছিলেন। মনোয়ারার হাতে থাকা ব্যাগটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাংলামটরের পেট্রোল পাম্পের গলির ৬৬ নম্বর বাড়িতে তারা বসবাস করেন। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরের ছোট চন্ডিগন্ড গ্রামে।
আবদুল মালেকের ছেলে মোর্শেদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, তার বাবা প্রাতভ্রমণের পর কাঁচাবাজার করতে গিয়ে মারা গেছেন। কিছুদিনের মধ্যে তার বাবা অবসরে যাবেন। বর্তমানে তিনি অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে ছিলেন। ৪০, পশ্চিম তেজতুরী বাজারে তারা বসবাস করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি। মোর্শেদ আলমরা দুই ভাই, দুই বোন। গতকাল বিকেলেই মালেকের লাশ সনাক্ত করে হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছেন তারা।
অপর লাশ দু’টি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আছে। এর মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি হলেন— ঘটনাস্থলে নিহত নুর মোহাম্মদ (৪০)। তার পিতার নাম মকবুল হোসেন। তিনি ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা। নুর মোহাম্মদ কমলাপুর এলাকায় কলা বিক্রি করতেন। অপরজনের পরিচয় এখনো মেলেনি। পরিচয় না মেলা লাশটি একজন নারীর। নিহত নারীর (২৫) পরনে সেলোয়ার কামিজ ও গোলাপী বোরখা।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মজিদ বলেন, দু’টি ট্রেন একই সময়ে এসে পড়ায় ভেতরে আটকে পড়া লোকজন বের হতে পারেননি। এদের মধ্যে ৪ জন মারা গেছেন। ট্রেনের ধাক্কায় সব মিলিয়ে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানান, রেলওয়ের সহকারী পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইদুল ইসলাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানান, চিকিত্সাধীন পাঁচ জনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন- দুই ফল বিক্রেতা মো. রাকিব (২০), তার চাচা ফজলু খান (৪০) ও নাবিস্কোতে চাকরি করা সৈয়দ হোসেন। সৈয়দ হোসেনও বাজার করতে সেখানে গিয়েছিলেন। চিকিত্সাধীন দুইজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে সৈয়দ হোসেনের অবস্থা বেশী খারাপ। তেজগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার খবর শুনে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুলিশের তড়িত্ তত্পরতার কারণে আহতদের জীবন রক্ষা করা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান আবু আহমেদ বলেন, রেলক্রসিং থেকে পশ্চিমদিকে মাছ বাজারের পেছনে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী যমুনা আন্তনগর ট্রেনটি কমলাপুরের দিকে যাচ্ছিল। একই সময়ে পাশের লাইন দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী কর্ণফুলী আন্তনগর ট্রেনটিও যায়। এ সময় রেললাইনের ওপর বাজার বসায় সেখানে মানুষের ভিড় ছিল।
