ব্যাপক কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার পালিত হলো নাইন-ইলেভেন হামলার ১৩তম বার্ষিকী। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য এই সন্ত্রাসী হামলায় ১১ জন বাংলাদেশীসহ ৯৬টি দেশের প্রায় ৩ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছিল। এ ঘটনার পর পাল্টে যায় গোটা বিশ্বের প্রেক্ষাপট। ২০০১ থেকে ২০১৪। সময়ের ব্যবধান ১৩ বছর। আর এই ১৩ বছরে বিশ্বের সব ঘটনা প্রবাহকে পেছনে ফেলে ধ্বংস্তুপের মধ্য থেকেই ‘বেদনাদায়ক অনুস্মারক’ হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র-১। ২০১৫ সাল থেকে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হবে।
এদিকে প্রতিবছরই ৯/১১ হামলার দিনটিতে নিউইয়র্কে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার জে ব্রাটন সাংবাদিকদের জানান, সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় প্রতিবছরের মত এ দিনটিতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সিটির ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা হয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল কায়দা সদস্যরা নাটকীয়ভাবে যাত্রীবাহী চারটি বিমান ছিনতাই করে একযোগে নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের গ্রাউন্ড জিরোতে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ার ও ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। প্রতিবছর দিনটি নানান আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বছর যত গড়াচ্ছে নাইন-ইলেভেনের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলো ততই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ছোট হয়ে আসছে আনুষ্ঠানিকতাও। তবে চাকচিক্য বাড়ছে গ্রাউন্ড জিরোর। আর জৌলুস বাড়ছে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের। কিন্তু নিহতের স্বজনেরা আজও জানে না কেন এই হামলা, প্রকৃত হামলাকারী কারা আর কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যদিও এই হামলার পর সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদাকে দায়ী করে আসছে মার্কিন প্রশাসন। তবে চলতি বছর ইরাকের ইসলামী জঙ্গি গ্রুপ আইএসআইএস-এর হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সবর্ত্র সতর্কাবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
১৩তম বাষির্কীতে বৃহস্পতিবার গতানুগতিক ধারায় নিউইয়র্ক সিটির গ্রাাউন্ড জিরোতে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণসভা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। প্রথম বিমান হামলার সময় অনুয়ায়ী নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে সকাল ৮টা ৪৪ মিটিটে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। এরপর হামলার সময় অনুযায়ী ৮টা ৪৬ মিনিটে নিরবতা পালনের মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর স্বজনেরা নিহতের নাম উল্লেখ করে স্মরণ করেন। এসময় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজের সাউথ লনে নিরবতা পালন করে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আরো পাঁচটি স্থানে হামলার নির্দিষ্ট সময় সকাল ৯টা ৩ মিনিট, সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট, সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট, সকাল ১০টা ৩ মিনিট এবং সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে নিহতদের স্মরণে নিরবতা পালন করা হয়।
নিউইয়র্কের স্মরণ অনুষ্ঠানে সাবেক মেয়র মাইকেল আর. ব্লুমবার্গ, নিউজার্সির গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এবং নিহতের নিকট স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে বিভিন্ন সড়কে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে প্লাকার্ড বহন করেন। অনেকে এই হামলার প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানেরও দাবি জানান।
এদিকে হামলার ১৩ বছর পর একই স্থানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র-১। এই ভবনটি নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ সুউচ্চ ভবন এম্পায়ার স্টেটকে ইতিমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে এবং আবার সর্বোচ্চ ভবনের খেতাব ফিরে পেয়েছে। ১০৪ তলা এই ভবনটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবে ২০১৫ সালে। এখন ভবনটির উচ্চতা ১৭৭৬ ফুট। চলতি বছর থেকে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র এলাকা দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
আধুনিক স্থাপত্য শৈলীর বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল। এটির স্থপতি ড্যানিয়েল লিবেসকিন্ড এবং ডেভিড চাইল্ড। বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র-৪ এবং মিউজিয়াম নির্মাণ কাজও শেষ হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে মিউজিয়ামটি দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। যে স্থানে টুইন টাওয়ার দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ঝর্ণা। আর ঝর্ণার চারপাশে কালো পাথরে খোদাই করে লেখা আছে নিহতদের নাম। ৯/১১ হামলার দিনটি ছাড়াও বছরজুড়ে নিহতের স্বজনেরা এখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। প্রিয়জনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
