নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইনের বাস্তবায়ন আগামী জুলাই থেকে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা এক বছর পিছিয়ে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তির মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ভ্যাট পর্যালোচনা কমিটি ব্যবসায়ীদের দাবি শুনবে। এর ভিত্তিতে নতুন আইনের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আলাপ করে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের মূল দাবি প্যাকেজ ভ্যাট প্রথা ও ভ্যাটের ভিন্ন ভিন্ন হার বহাল রাখার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেয়ার দাবি আছে। এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। এক বছর পিছিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। অবশ্য তার আগে ব্যবসায়ীরা কী চায় সেটা বিবেচনায় নেয়া হবে।
১৯৯১ সালে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান দেশে প্রথমবারের মত ভ্যাট প্রথা চালু করেন। এর পর বিভিন্ন সময়ে আইনটির সংশোধন হয়েছে। গত ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন সংসদে পাশ হয়। তিন বছর পর থেকে (২০১৫ সালের জুলাই) আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী ভ্যাট আইন প্রণয়ন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষিত হয়েছে। এর পররই আইনটির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বিপাকে পড়ে সরকার। সর্বশেষ অর্থমন্ত্রীকে লেখা এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের একটি চিঠি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এর ভিত্তিতে গত বুধবার বড় পরিসরে ব্যবসায়ীদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইনটি নতুনভাবে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে এনবিআর ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পর্যালোচনা কমিটি গঠনেরও ঘোষণা দেয়া হয়।
এফবিসিসিআইয়ের ভ্যাট বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান আব্দুর রাজ্জাক পর্যালোচনায় প্যাকেজ পদ্ধতি ও ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট দেয়ার বিষয়টি নতুন আইনে যুক্ত করা হবে আশা করছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে ব্যবসায়ীদের আপত্তি ৭টি। এর মধ্যে প্রধান দুটি আপত্তি হচ্ছে প্যাকেজ পদ্ধতি ও ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট দেয়ার প্রথা বাতিল করা। দেশের ৮০ শতাংশ উত্পাদন খাত ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের। তাদের পক্ষে উপকরণের হিসাব রাখা বাস্তবে সম্ভব হয় না। ফলে উপকরণ রেয়াত নেয়া কার্যত অসম্ভব। এ জন্য ভ্যাটের ভিন্ন ভিন্ন হার রাখার পক্ষে আমরা মত দিয়েছিলাম। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইউরোপের অনেক উন্নত দেশসহ বিশ্বের বহু দেশেই একাধিক হারে ভ্যাট দেয়ার প্রথা এখনো বিদ্যমান। অথচ আমরা কোন ব্রাহ্মণ হয়ে গেলাম যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে? অথচ অনেক বড় উত্পাদক রেয়াত নেয়ার পর প্রকৃত অর্থে তাদের ভ্যাট দিতে হয় ৩ থেকে ৪ শতাংশ।
একাধিক ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিক্রয় পর্যায়ে প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট দিতে হয়। কিন্তু অনেক হাত ঘুরে পণ্য ক্রেতার কাছে বিক্রি হয়। খুচরা পর্যায়ে এসব হিসাব রাখা প্রকৃত অর্থে জটিল। এক্ষেত্রে ভ্যাট কর্মকর্তাদের হাতে ক্ষমতা রেখে দেয়ায় তারা ইচ্ছেমত ভ্যাট ধার্য করছেন। ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে অবৈধ লেনদেন করতে বাধ্য হন। এতে ওই কর্মকর্তা অবৈধ অর্থ পেলেও সরকারের ঘরে কাঙ্খিত অর্থ যাচ্ছে না। এই সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে প্যাকেজ পদ্ধতি ঠিক করার দাবি জানান আব্দুর রাজ্জাক।
এফবিসিসিআই সূত্রে জানা গেছে, চীন, জাপান, ভারত, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনসহ আরো বেশকিছু দেশে ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট প্রথা চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট দেয়ার পদ্ধতি বহাল রয়েছে। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইনে এটি তুলে দিয়ে সবার জন্য ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে আমদানি, উত্পাদন, ব্যবসায়ী ও সেবার উপর ভ্যাট দিতে হয়। কিন্তু নতুন আইনে বাছবিচারহীনভাবে ভ্যাট আদায়ের পরিধি ব্যাপকতর করা হয়েছে। এ আইনে আমদানি, উত্পাদন, ব্যবসায়ী পর্যায় এবং সেবার উপর ছাড়াও স্থাবর সম্পত্তি, লীজ, গ্রান্ট, লাইসেন্স, পারমিট, রাইট, ফ্যাসিলিটি ইত্যাদির উপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ফলে ভ্যাটের ভিত্তি সমপ্রসারিত হয়েছে। এফবিসিসিআই মনে করে, ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণ করার জন্য নতুন করে আইনের প্রয়োজন নেই। বর্তমান আইনে এই ধারা অন্তর্ভুক্ত করলেই ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারিত হয়ে যাবে। এ ছাড়াও যে সব সংস্কার আনার লক্ষ্যে নতুন আইন করা হয়েছে এর সঙ্গে একমত নয় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন। এফবিসিসিআই মনে করে, বিদ্যমান আইনে এসব ধারা যুক্ত করেও চলমান আইনটি রাখা যায়।
এনবিআর নতুন ভ্যাট আইনের সুবিধা তুলে ধরে বলছে, ২৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার (লেনদেন) বিশিষ্ট উত্পাদকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিদ্যমান আইনেই ব্যবসায়ীদের জন্য এ সুবিধা রয়েছে।
ইঅ/চৌফে/শ৬৫৩
