বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে আলোচকরা বলেছেন, বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে এখনই দেয়া উচিত হবে না। আলোচনার ভিত্তিতে বিদ্যমান সংসদ, বিচার ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে এ ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থেকে সংসদে যেতে পারে। এজন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পরিবর্তন খুবই জরুরি। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের আগে সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারন বা অভিশংসনের ক্ষমতা গেলে ঐ ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিচারকরা রাজনীতিকদের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়বে এবং আদালতে রাজনৈতিক দলাদলি আরো বাড়বে। দেশে বিচারপতি নিয়োগের জন্য কোন আইন নেই। তবে তাদের অপসারনের জন্য সুপারসনিকের মত এত দ্রুত গতিতে কেন সংবিধানে সংশোধনী আনা হচ্ছে। এতে সরকারের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শনিবার বিকালে রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের ৮৫তম পর্বে আলোচক ও দর্শকরা এ কথা বলেন।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন এবং বিবিসি বাংলা যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংলাপে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক আব্দুল মতিন খসরু, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসিম আখতার হুসেন।
বিচারপতিদের অপসারনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিলটি পাশ হলে গণতন্ত্র ও বিচারবিভাগের স্বাধীনতা আরো বেশী সুরক্ষিত থাকবে কিনা, একজন দর্শকের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, সংবিধানে কোন সংশোধনী আনতে হলে আলোচনা দরকার। সংশোধনী কেন আনা হচ্ছে তার ব্যাখ্যা এবং এর ফলে সৃষ্ট শঙ্কা ও এর সমাধানে আলোচনার বিকল্প নেই। পূর্বাপর না ভেবে চট করেই বাহাত্তরের সংবিধানে চলে যাওয়া যায় না। বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারপতিদের অপসারনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তখনকার প্রেক্ষাপট আর এখনকার প্রেক্ষাপট এক নয়। ৯৬ অনুচ্ছেদের মতই একই বিধান রয়েছে ভারতের সংবিধানের ১২৪ অনুচ্ছেদে। সেখানে এ বিষয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ বলছেন সংবিধানে সংশোধনী আনার তিন মাসের মধ্যে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হবে। এখন সংশোধনীর সময় আইনের কোনো খসড়াও নেই। এটি তৈরি না করে তড়িঘড়ি করে, সুপারসনিক গতিতে কেন ষোড়শ সংশোধনীর বিল পাস করার চেষ্টা চলছে।
কামাল হোসেন বলেন, জাতীয় সংসদ কি ৪২ বছর নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছে? তাহলে সংসদ কীভাবে বিচারকদের অপসারণের সময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে? আমাদের সংসদের কাজ হয় দলীয়ভাবে। পার্টি বা পার্টির প্রধান অসন্তুষ্ট হয় এমন কোনো কাজ সদস্যরা করতে পারেন না।
আওয়ামী লীগের আব্দুল মতিন খসরু বলেন, সংশোধনীর পর এ বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে আইন প্রণয়ন করা হবে। এর আওতায় তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হবে। যেসব বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠবে, এ প্যানেল তা তদন্ত করে সংসদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব দিবে। সংসদ শুধু সিল (অনুমোদন) দিবে। বিচারপতিদের অপসারনের বিষয়ে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সম্মতি লাগবে। এ সংশোধনীর ফলে দেশ একদলীয় শাসনের দিকে এগিয়ে যাবে, একজন দর্শকের এমন মন্তব্য তিনি নাকচ করে দেন।
তিনি বলেন, সংশোধনী পাস হওয়ার পর এবং আইন প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত নেয়া হবে। সংশোধনীর আগে আলোচনার দাবি উঠেছে, এটি হলে ভালোও হত।
বিএনপির আমীর খসরু বলেন, দেশে বিচারবিভাগের যতটুকু স্বাধীনতা আছে, এ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বিদায় দেয়া হচ্ছে। অনির্বাচিত সংসদ ও অবৈধ সরকারের হাতে দেশ চলছে বলেই এ চেষ্টা হচ্ছে। তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সময়ও সরকার এমন তাড়াহুড়া করেছিল। সরকারের উদ্দেশ্য সত্ নয়।
অধ্যাপক নাসিম আখতার বলেন, জনতা বিচারকদের বিচারের জন্য জাগেনি। সংসদ সদস্যরা তাদের বিচার করতে চাচ্ছেন। এর ফলে বিচারকদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হবে। যে দ্রুততা নিয়ে সরকার গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তাতে জনগণ শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
আওয়ামী লীগের জনসম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং বিএনপির দুর্বল হওয়া প্রসঙ্গে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, বড় দলগুলো অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। মনোনয়ন বাণিজ্য হচ্ছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র টাকা দিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে। ব্যাংকের লুটপাটের টাকা কোথায় যাচ্ছে? কারো টাকার ব্যবহার বন্ধ না হলে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিরাপদ-সুন্দর হবে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ইউজিসির ভূমিকা বিষয়ে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে নাসিম আখতার বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজার-মুনাফা নির্ভর হয়ে পড়েছে। এরমধ্যেই কোনটি ভালো করছে, কোনটি বাজেভাবে চলছে। আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার। তাই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে ইউজিসিকে কঠোর হতে হবে। তবে এগুলোকে বন্ধ না করে শুদ্ধ ও সংশোধিত হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত।
আমীর খসরু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যবস্থাপনায় নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। এটি নিশ্চিত করতে হবে। ড. কামাল হোসেন বলেন, এ বিষয়ে আইনের ঘাটতি নেই। প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয়। যারা এ অনুমোদন দেয়, তারাই দুর্নীতিগ্রস্তদের রক্ষা করে। এর পরিবর্তন আনতে হবে। আব্দুল মতিন বলেন, বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সনদ বাণিজ্য করছে। এ বিষয়ে ইউজিসিকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহন করতে হবে।
অবৈধভাবে দখলকৃত রেলওয়ের জায়গায় দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর দায় কার, দর্শকের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, গত ২০/২৫ বছর ধরে সরকারগুলো ছিন্নমূলদের পুনর্বাসনের কথা বলছে। কিন্তু এটি ঠিকভাবে কেন হচ্ছে না। এ জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের উপর চাপ তৈরি করতে হবে।
আমীর খসরু বলেন, সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসতে ও থাকতে যাদের সাহায্য নিয়েছে তাদের সুবিধা দিতেই রেলওয়ের জায়গা দখলমুক্ত করতে পারছে না। ছিন্নমূলদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটনো যায়। এতে রাজনীতি একটা বাধা। দলীয়করণ সবসময়ই হয়েছে, তবে এখন এটি বহুগুণ বেড়েছে। ওয়ালিউর রহমান মিরাজের প্রযোজনায় অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনা করেন আকবর হোসেন।
