এরশাদ-রওশন ঐক্য চেয়েছেন জাপার এমপিরা

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১০:৪০

জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুসহ দলীয় অন্তত ১৭ জন সংসদ সদস্য নিজেদের সংসদীয় দলের বৈঠকে যাননি। গতকাল রবিবার বিকালে সংসদ ভবনের তৃতীয় তলায় বিরোধী দলের সভাকক্ষে যখন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের সভাপতিত্বে সংসদীয় দলের বৈঠক চলছিল, তখন এর ঠিক নিচের ফ্লোরেই পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও বাবলুসহ ১০-১২ জন এমপিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে পাওয়া কার্যালয়ে বসে পৃথক বৈঠক করছিলেন এরশাদ।

অন্যদিকে, সংসদীয় দলের বৈঠকে এরশাদ-রওশন দম্পতির ঐক্য চেয়েছেন উপস্থিত এমপিরা। রওশন এরশাদকে উদ্দেশ্য করে তারা অভিন্ন কণ্ঠে বলেছেন ‘দলের একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপ নিজেদের স্বার্থে আপনাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে রেখেছে, আপনারা দু’জন এক হয়ে কাজ করুন, দলকে ঐক্যবদ্ধ করুন, কারণ আপনাদের বিভক্তির কারণে পুরো দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

সংসদ অধিবেশনে কিছুক্ষণ অবস্থান শেষে সংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় এরশাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি পার্টির চেয়ারম্যান। সংসদীয় দলের বৈঠক ডাকতে হলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমার অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আমার অনুমতি নেয়া হয়নি। বৈঠকের বিষয়ে আমাকে আগে জানানোও হয়নি।’ তবে এরশাদের সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তিগত স্টাফ ইত্তেফাককে জানান, এরশাদ নাকি বলেছেন ‘রাঙ্গা আমাকে ওইদিন (বৃহস্পতিবার) সংসদ লবিতে এভাবে গালাগাল করলো, আমি এখন কীভাবে ওই বৈঠকে যাই’। প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা গতকাল সংসদীয় দলের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তবে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বিরোধী দলের লবিতে ইত্তেফাককে জানান, বৈঠকের বিষয়ে দলের চেয়ারম্যানকে জানানো হয়নি। বাবলার এই তথ্য অসত্য বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও বিরোধী দলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ। তারা দু’জন ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, বৈঠকে যোগদানের অনুরোধ জানিয়ে শনিবার অন্তত তিনবার এরশাদকে এসএমএস করা হয়েছে, এমনকি বিরোধী দলীয় নেতার সংসদ কার্যালয় থেকে তাকে ফোনও করা হয়েছে।

এরশাদ যে কেন আসলেন না বুঝলাম না: রওশন
সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সময় রওশন এরশাদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওনাকে (এরশাদ) তো বৈঠকে আসার জন্য বলা হয়েছে। কেন যে আসলেন না বুঝলাম না।’ এরশাদ তো এতক্ষণ তার কক্ষেই ছিলেন, এমন কথা জানালে তিনি বলেন ‘তাই নাকি, তাহলে বৈঠকে এলেন না কেন!’ এরশাদ তো একটু আগে অধিবেশন কক্ষেও ঢুকলেন, এমন কথা বললে রওশন বলেন ‘ও তাই, তিনি অধিবেশনে আছেন!’

সংসদীয় দলের বৈঠকে চার বিষয়ে আলোচনা
দুপুর ২টায় সংসদীয় দলের বৈঠক বসার কথা থাকলেও তা শুরু হয় বিকাল প্রায় পৌনে চারটার দিকে। পাঁচটার কয়েক মিনিট পর বৈঠক শেষ হয়। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আমাদের দলে কোনো বিভক্তি বা গ্রুপিং নেই। জাপা এক ও ঐক্যবদ্ধ। তিনি জানান, বৈঠকে চারটি বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রথমত: কাজী ফিরোজ রশীদকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করার বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে রওশন এরশাদ যে চিঠি দিয়েছেন, গতকালের বৈঠকে বলা হয়েছে-এ ব্যাপারে আগের সংসদীয় দলের বৈঠকের সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে। অর্থাত্ কাজী ফিরোজ রশীদকেই জাপা বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত করেছে।

দ্বিতীয়ত: বৈঠকে বলা হয়েছে- দলের চেয়ারম্যান (এরশাদ) একক ক্ষমতায় প্রেসিডিয়াম থেকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে বাদ দিয়েছেন। দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক চেয়ারম্যান এটি করতে পারেন। তবে তাদের দুই জনের কোনো ভুল থাকলে তা ক্ষমা করে প্রেসিডিয়াম থেকে অব্যাহতির বিষয়টি যেন প্রত্যাহার করা হয়, সেজন্য বৈঠকে সবাই একমত হয়েছেন। এ ব্যাপারে সংসদীয় দলের প্রধান রওশনকে অনুরোধ করা হয়েছে, তিনি যেন এরশাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি মীমাংসা করেন। তৃতীয়ত: গতকালের বৈঠকে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিরোধী দল বিলটিতে সমর্থন দেবে। তবে বিলটির ওপর গতকাল সংসদে উত্থাপিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন দলীয় ফোরামে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আর চতুর্থ যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা হলো- মন্ত্রিসভা থেকে জাপার বের হয়ে আসা না আসা প্রসঙ্গে। বৈঠকে সবাই একমত হন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত জাপা আপাতত মন্ত্রিসভায় থাকবে। এরশাদসহ কয়েক এমপি কেন বৈঠকে আসেননি, এই প্রশ্নের জবাবে চুন্নু বলেন, এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে তাজুল ইসলাম চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
স্বামী-স্ত্রীর ঐক্য চান এমপিরা

সংসদীয় দলের বৈঠকে যোগ দেয়া জাপার আটজন এমপির সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে জানা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত এমপিদের প্রায় সবাই অভিন্ন সুরে এরশাদ-রওশনের ঐক্য চেয়েছেন। সূত্রমতে, বৈঠকে রওশনকে উদ্দেশ করে এ কে এম মাইদুল ইসলাম বলেছেন, ‘ম্যাডাম, আপনারা দুইজন এক হয়ে যান। আপনাদের দুইজনের অনৈক্যের কারণে আমরা এমপিরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছি, কখন কার ডাকে সাড়া দেব সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’ বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী চুন্নু বলেছেন, ‘রাঙ্গা ও তাজুল সাহেবকে প্রেসিডিয়াম থেকে এভাবে বাদ দেয়া ঠিক হয়নি। আমরা আপনাকে (রওশনকে) অনুরোধ করছি- আপনি এ বিষয়ে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে কথা বলে এটি প্রত্যাহার করিয়ে নেবেন। না হয় আরো ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে।’ সূত্রমতে, গত বৃহস্পতিবার সংসদ লবিতে বাবলুর সঙ্গে রাঙ্গা-তাজুলের ঝগড়ার বিষয়টি ইঙ্গিত করে বৈঠকে জাপার সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন ‘বৃহস্পতিবার যে ঘটনা ঘটলো তা দলকে বিব্রত করেছে। এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে সেজন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’ দলের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা জানান, বৈঠকে তিনিও এরশাদ-রওশনকে এক হতে বলেছেন। ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, বৈঠকে তিনি বলেছেন- একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপ নিজেদের স্বার্থে দলের চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় নেতার মধ্যে বিভক্তি জিইয়ে রেখেছে। এটাকে মিটিয়ে ফেলতে হবে।

নিজ কার্যালয়ে কয়েক এমপিকে নিয়ে এরশাদের অবস্থান : জিয়াউদ্দিন বাবলু, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাসহ এরশাদ পৌনে পাঁচটার দিকে সংসদ ভবনে এসে নিজ কার্যালয়ে ঢুকেন। এর আগে-পরে সেখানে যান দলের এমপি মুজিবুল হক চুন্নু, সেলিম ওসমান, এম এ হান্নান, সেলিম উদ্দিন, সালমা ইসলাম, পীর ফজলুর রহমান, আব্দুল মুনিম চৌধুরী বাবু, ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নোমান ও হাজী মোহাম্মদ ইলিয়াস। তবে এরশাদের কক্ষে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার উপরের ফ্লোরে রওশনের সভাপতিত্বে চলা সংসদীয় দলের বৈঠকেও যোগ দেন প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, সেলিম উদ্দিন ও ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী। বিকাল পাঁচটার কিছুক্ষণ পর সংসদ অধিবেশন শুরু হলে ঠিক ৫টা ১০ মিনিটে নিজ কক্ষ থেকে বের হয়ে সোজা অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন এরশাদ। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ও মোহাম্মদ নোমান। এসময় কেন পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে যাননি, জানতে চাইলে নোমান ইত্তেফাককে বলেন ‘স্যার (এরশাদ) না গেলে আমরা যাই কী করে’।

রওশনের পাশে কয়েক মিনিট এরশাদ:এরশাদের প্রবেশের পাঁচ মিনিট পরেই অধিবেশন কক্ষে যান রওশন এরশাদ। পাশাপাশি আসনে বসা এরশাদ-রওশনকে এসময় দু’-একবার কথা বলতে দেখা গেছে। তবে কয়েক মিনিট পরেই এরশাদ অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।

বৈঠকে যোগ না দেয়ার বিষয়ে যার যে বক্তব্য:বৈঠকে যোগ না দেয়ার বিষয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলু ইত্তেফাককে জানান, তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন, এ কারণে দেরি হওয়ায় আর বৈঠকে যোগ দেননি। অবশ্য তিনি এরশাদের সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার কক্ষেই ছিলেন। বিরোধী দলের লবিতে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ইত্তেফাককে বলেন ‘আমার এলাকায় কিছু ঝামেলা ছিল, এ কারণে থাকতে পারিনি, আমি বাসা থেকে সরাসরি অধিবেশনে আসলাম’। অবশ্য এর আগে দীর্ঘক্ষণ তিনি এরশাদের সঙ্গেই তার কক্ষে ছিলেন। সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সময় লবিতে দেখা হয় জাপার এমপি নূরুল ইসলাম মিলনের সঙ্গে, তিনি জানান, ঢাকার বাইরে থাকায় তিনি বৈঠকে আসতে পারেননি। দলের এমপি মাহ্জাবীন মোরশেদও অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সময় এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রামে ছিলেন, সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে সরাসরি অধিবেশনে এসেছেন। একই কথা জানান জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এমএ হান্নান। হান্নানও এরশাদের সঙ্গে তার কক্ষে বসা ছিলেন।

সংসদীয় দলের বৈঠকে উপস্থিতি নিয়ে দু’রকম বক্তব্য:সংসদীয় দলের বৈঠকে কতজন উপস্থিত ছিলেন, এনিয়ে দু’রকম বক্তব্য পাওয়া গেছে। কাজী ফিরোজ রশীদ জানান, বৈঠকে দলের ৪০ জন এমপির মধ্যে ২৩ জন উপস্থিত ছিলেন, তারা সবাই উপস্থিতির তালিকায় স্বাক্ষরও করেছেন। আর জিয়াউদ্দিন বাবলু জানান, ১৮ জন সংসদীয় দলের বৈঠকে গেছেন। এসময় কয়েকজন এমপির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরা কেউই সংসদীয় দলের বৈঠকে যাননি।

বাবলু-রাঙ্গার আড্ডা: সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে এবং এরশাদ চলে যাওয়ার পর অধিবেশন কক্ষে প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গার সঙ্গে বেশ খোশ মেজাজে আড্ডা দিতে দেখা গেছে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে। বাবলুর আসন বিরোধী দলের প্রথম সারিতে হলেও তিনি উঠে গিয়ে দ্বিতীয় সারিতে রাঙ্গার পাশের আসনে বসেন, বেশ কিছুক্ষণ তাদের হাসিমুখে কথা বলতে দেখা গেছে। এসময় পাশে প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুও ছিলেন।