একদিকে উচ্ছেদ আরেকদিকে দখল হয়ে যাচ্ছে রেলের জমি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রেলের উভয় পাশে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজার ও অবৈধ বস্তি উচ্ছেদে মাঠে নামলেও সাফল্য শূন্য। রাজধানীর কাওরান বাজার রেলক্রসিংয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত হলে রেললাইনের দু’ধারে এই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। গত চারদিনে মগবাজার ও মালিবাগ এলাকায় প্রায় ৪ হাজার দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযান শেষ হতে না হতেই পুনরায় রেলের দুই পাশের ফাঁকা জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দেদারচ্ছে এই দখল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এই দখল বাণিজ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদদ যোগাচ্ছে পুলিশ ও রেলবিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তা। সোমবার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ‘ইত্তেফাক’কে বলেছেন, যে কোন মূল্যে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। অবৈধ স্থাপনা যাতে পুনরায় গড়ে উঠতে না পারে সে বিষয়টিও নজরদারি করা হবে।
পুরান ঢাকার জুরাইন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রেললাইনের উভয় পাশে প্রায় পাঁচ হাজার অস্থায়ী কাঁচামালের দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসব দোকান স্থায়ীই ছিল। গত শনিবার পুলিশ ও রেলওয়ের লোকজন এসে এসব দোকান ভেঙ্গে দিয়েছে। ফলে সবাই এখন অস্থায়ী দোকানদার। রেল আসার আগে সবাই যে যার মত করে টুকরিতে থরে থরে সবজি সাজিয়ে বসে। ট্রেনের হুইসেল পাওয়ামাত্র নিমেষে রেললাইন থেকে সটকে পড়ে। দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন জুরাইন রেলক্রসিং পার হয়ে যায় যাত্রীবাহী ট্রেন। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। এভাবেই আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, গত শনিবার পুলিশ ও রেলবিভাগের কর্মচারী-কর্মকর্তারা এসে রেললাইনের উভয় পাশের প্রায় পাঁচ হাজার কাঁচাবাজার উচ্ছেদ করে। পরেরদিন রবিবার স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এসে রেললাইনের পাশে পুনরায় দোকান বসাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি আহবান জানান। তারা বলেন, আপাতত অস্থায়ী ভিত্তিতে দোকান বসান পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে স্থায়ীভাবে দোকানপাট গড়ে দেয়া যাবে। স্থানীয় পুলিশও এতে সায় দেয়।
আলমগীর হোসেন নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, পুলিশ ও রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন টাকা-পয়সা দিতে হয়। প্রতিদিন নেতাদের দিতে হয় ৩শ’ টাকা, পুলিশ নেয় দোকান প্রতি ২শ’ আর রেলওয়ের কর্তাব্যক্তিরাও ২শ’ টাকা করে বখরা আদায় করে থাকে। ইতিপূর্বে দোকান প্রতি ১২শ’ টাকা করে আদায় করা হতো। দোকান ভেঙ্গে দেয়ায় বর্তমানে ৭শ’ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এই ব্যবসায়ী । এভাবে প্রতিদিন ৫হাজার দোকান থেকে কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী। চাঁদা না দিলে এদের নানা ভাবে হয়রানি করা হয়।
জুরাইন রেললাইন ধরে একটু এগিয়ে গেলেই গেণ্ডারিয়া ঘুণ্টিঘর। এখানে থামে ট্রেন। যাত্রী উঠা-নামা করে। ঘুণ্টিঘরের সামনে রেললাইন। তার অপর পাশে রেললাইন ধরে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল বস্তি। এখানে প্রায় আড়াই হাজার নিম্ন আয়ের মানুষ বাস করে। এই বস্তিতে কয়েকজন পঙ্গু শিশুর দেখা মিলে। এদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রেনে কাটা পড়ে এরা হাত-পা হারিয়েছে। সালমা বেগম জানান, গত বছর তার ছেলের ডান পা কাটা পড়েছে। হাসান লাইনের উপর খেলছিলো। একটি ট্রেন তার পায়ের উপর দিয়ে চলে গেলে ডান পা কাটা পড়ে। তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালে ভার্তি করা হলে দীর্ঘ দিন চিকিত্সার পর সে ঘরে ফেরে। অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে খিলগাঁও, মালিবাগ, মগবাজার এলাকায়।
দুই বছরে নিহত পাঁচ শতাধিক
হরহামেশা বেওয়ারিশ লাশ মিলে রেললাইনে। রেলে কাটা পড়ে মারা গেলে নিহতের পরিবার রেল কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে না। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, গত দুই বছরে সারাদেশে ট্রেনে কাটা পড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ মারা গেছে। মাসে গড়ে পাঁচবার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। সেইসঙ্গে চলন্ত ট্রেনে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
৬ হাজার একর জমি বেহাত
সারাদেশে রেলওয়ের মোট ৬১ হাজার ৬০৫ দশমিক ৮৪৯ একর জায়গা আছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ২৪ হাজার ৪০১ দশমিক ৬২ একর ও পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭ হাজার ২০৪ দশমিক ২২৯ একর। উভয় অঞ্চল মিলে প্রায় ৬ হাজার একর জমি রেলের বেহাত রয়েছে। সারা দেশেই রেলওয়ের জমি দখল অব্যাহত আছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, রাজধানীতে প্রায় ৬৬টি স্পটে কাঁচাবাজার ও শতাধিক স্পটে বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় রেললাইনের আশপাশে এক কিলোমিটারজুড়ে ছিল বস্তি আর দোকানঘর। ফলে প্রায়ই ঘটেছে দুর্ঘটনা। সামপ্রতিক ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর দোকানঘরগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথের ১৭টি বাজার ট্রেন চলাচলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে রেললাইনের পাশের জায়গা দখল করে সরকারদলীয় লোকজন অন্তত চারটি বড় মার্কেটও গড়ে তুলেছে। আর রেললাইনের ওপরে বসা বাজারগুলোতে এমন ব্যবসা চলে যে, ট্রেন এলে দোকানিরা পণ্যের ডালা হাতে তুলে দাঁড়িয়ে নানা কসরত করে ট্রেনের ধাক্কা থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। ট্রেন চলে গেলে আবার পসরা সাজিয়ে বসেন। এই ৬৬টি কাঁচাবাজার, মাছবাজার ও গরুর হাটের বেশিরভাগেরই অবস্থান রেললাইনের ওপরে, স্টেশনের পাশ ঘেঁষে ও রেলক্রসিং ধরে। কিছু কিছু বাজার গড়ে উঠেছে সংলগ্ন বস্তিকে কেন্দ্র করে।
রেললাইনে হাঁটাচলাও অপরাধ
রেলের মহাপরিচালক মো. তাফাজ্জল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, অবৈধ দখল এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁচেছে সকালে উচ্ছেদ করলে বিকালে পসরা নিয়ে বসে যায় । মালামাল জব্দ করা হলেও কাজ হয় না। রেললাইনের উভয় পাশের ১০ ফুট করে ২০ ফুট জায়গায় সবসময় ১৪৪ ধারা বলবত্ থাকে। রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটা-চলাও আইনত অপরাধ। কিন্তু এ আইন সম্পর্কে কারো কোন ধারণা না থাকায় রেললাইনের পাশে অবৈধ বসতি, কাঁচাবাজার গড়ে উঠছে। উল্লেখ্য, যেসব স্থানে একাধিক রেললাইন আছে, সেখানে দুই রেললাইনের ফাঁকে আট ফুট জায়গা থাকে। দুইটি ট্রেন পাশাপাশি চললে ফাঁকা জায়গার পরিমাণ পাঁচ ফুটে নেমে আসে। লাইনের দুই পাশে অবৈধ দোকান আর বস্তি থাকায় লাইনের মাঝখানে যাঁরা থাকেন, তাঁদের আসলে সরে যাওয়ারও জায়গা থাকে না। এমন এক পরিস্থিতিতে দুই ট্রেনের মাঝের সংকীর্ণ জায়গায় আটকা পড়ে ট্রেনের ধাক্কায় গত বৃহস্পতিবার চারজন মারা যান।
