একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের রায় আজ বুধবার ঘোষণা করা হচ্ছে। পাঁচ মাস অপেক্ষমাণ থাকার পর আপিল বিভাগের আজকের কার্যতালিকায় রায়ের বিষয়টি এক নম্বরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রায় ঘোষণার প্রেক্ষাপটে সারাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি একেএম শহীদুল হক জানান, যেকোন ধরনের নাশকতা মোকাবেলায় সারাদেশের পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহ্াব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এটি হবে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের দ্বিতীয় রায়।
সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তির আশা ব্যক্ত করেছেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। গতকাল নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড আশা করে। ট্রাইব্যুনাল যেসব অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আপিল বিভাগ সেসব অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। অন্য অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে।’ এ মামলায় রিভিউয়ের সুযোগ আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি আগে থেকেই বলে এসেছি এটি বিশেষ আইন। এ আইনে রিভিউয়ের সুযোগ নেই। কাদের মোল্লার মামলায় আসামিপক্ষ রিভিউ আবেদন দায়ের করেছিল। আপিল বিভাগ ওই আবেদন শুনানি শেষে খারিজ করে দেয়। ওই রায়ের কপি আমি এখনও পাইনি। ওই কপি পাওয়া গেলে বুঝা যাবে এ মামলায় রিভিউয়ের সুযোগ আছে কি-না?
অন্যদিকে, সাঈদী বেকসুর খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এ মামলা নিয়ে সারা দুনিয়ার আগ্রহ রয়েছে। এ মামলাতেই স্কাইপ কেলেঙ্কারি ও সাক্ষী অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালী হত্যা মামলায় সাঈদী আসামি ছিলেন না। এতোসব বিষয়ের পর আমরা আশা করছি সুপ্রিম কোর্ট ন্যায় বিচার করবে এবং সাঈদী খালাস পাবেন।’
গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগের মধ্যে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়ার দু’টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। আরো ছয়টি অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলেও দু’টি অভিযোগে ফাঁসির আদেশ হওয়ায় সেগুলোতে কোন দণ্ড দেয়নি ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের পর সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর ২৮ মার্চ আপিল করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। অন্যদিকে, প্রমাণিত হলেও সাজা না হওয়া ছয় অভিযোগে তার শাস্তি চেয়ে আপিল করে সরকারপক্ষ। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। ৪৯ কার্যদিবস শুনানিতে আসামিপক্ষে মূল শুনানি করেন আইনজীবী এসএম শাহজাহান। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
শুনানিতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দেলাওয়ার শিকদার এক ব্যক্তি কি না সে প্রশ্ন বারবার উত্থাপিত হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেছিলেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দেলাওয়ার শিকদার আলাদা ব্যক্তি। তাদের পিতার নামও আলাদা। রাষ্ট্রপক্ষ একটি ডকুমেন্টও হাজির করতে পারেনি যেখানে শিকদার পরিবর্তন করে সাঈদী যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।’
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়, দেলাওয়ার শিকদার এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একই ব্যক্তি। সাক্ষীরা কোথাও বলেননি যে, দেলাওয়ার শিকদার এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আলাদা ব্যক্তি। গত ১৬ এপ্রিল চূড়ান্ত শুনানিশেষে সাঈদীর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে আপিল বিভাগ।
এর আগে যুদ্ধাপরাধের একটি মামলা আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল। ওই রায় অনুযায়ী জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। মারা যাওয়ার কারণে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলিমের মামলার ইতি টেনেছে আপিল বিভাগ। জামায়াতের আরেক নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল শুনানি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আজ এ আপিলের শুনানি শেষ হতে পারে।
এছাড়া শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা। দুটি ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের নয়টি মামলায় ১০ জনের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করেছে। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীসহ পাঁচ জনের মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার
রায়কে কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সদর দফতর থেকে সারাদেশের জেলা পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তত্পরতাও।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে যাতে কোন ধরনের নাশকতা ও সহিংসতা না ঘটে সে জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেন, পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আদালতসহ আশপাশ এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরা জেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় বেশি নজর রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গতকাল পুলিশ সদর দফতর থেকে মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্ট জেলাসমূহের পুলিশ সুপারদের জানানো হয়েছে।
গত বছর সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি জেলায় একটি মহল গুজব ছড়িয়ে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছিল। সহিংসতায় ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও যানবাহন ভাংচুর করা হয়েছিল। নিরীহ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এধরনের অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে এবার পুলিশ সদর দফতর থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ দিকে রায় ঘোষণার খবরে গতকাল রাজধানীতে মানুষের মধ্যে কিছু আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর নগরীতে যানবাহন চলাচল অনেক কমে যায়।
চট্টগ্রামে সতর্ক পুলিশ
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, সম্ভাব্য নাশকতা মোকাবেলায় চট্টগ্রামে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার রাত থেকেই পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে বিজিবিকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সিএমপির উপ-কমিশনার (সদর) মাসুদ উল হাসান ইত্তেফাককে জানান, নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তিন হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকবে। প্রয়োজনে বিজিবি, এপিবিএন ও শিল্প পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হবে।
পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, যে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর রায় ঘোষণার পর জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটেছিল। ওইসব এলাকায় পুলিশের নজরদারি জোরদার করা হবে।
গত বছর সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক তাণ্ডব ঘটায় জামায়াত-শিবির। এসব ঘটনায় কয়েকজন হতাহত হওয়া ছাড়াও নির্বিচারে যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সাঈদীর এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
পিরোজপুর অফিস :মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের রায় ঘিরে পিরোজপুরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সাঈদীর নিজ উপজেলা জিয়ানগর ও জেলা সদর পিরোজপুরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সারা জেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলায় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী মামলার কয়েক সাক্ষীকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা প্রদানের জন্য পাড়েরহাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক বৈঠকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি, র্যাব, এপিবিএনসহ পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশেষ আইন-শৃংখলা বিষয়ক জেলা কোর কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকীর সভাপতিত্বে পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, আনসারের জেলা কমান্ড্যান্টসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর পিরোজপুরসহ সারা দেশে যে মারাত্মক সহিংসতা ঘটেছিল তা মাথায় রেখে জেলায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
