প্রশাসনে বন্ধ হয়নি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৭:৪২

তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রশাসন সংস্কারে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ (পোস্টিং), পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসহ বেশকিছু ঘটনায় প্রশাসনে এখনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। শীর্ষ অর্থাত্ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর বরখেলাপ ঘটছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৯ সালের ১২ জুন সচিবদের সঙ্গে প্রথম সভায় বলেছিলেন, কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা হবে যোগ্যতা, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে। পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণও ছিল তার প্রতিশ্রুতির অন্যতম। আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫ (৬) ধারায় দেয়া প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, দলীয়করণমুক্ত গণমুখি প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা। এ ছাড়া প্রশাসনিক সংস্কার, তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ই-গভর্নেন্স চালু ও সরকারি কর্মকর্তাদের স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন। তবে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দলীয় ইশতিহারে প্রশাসন নিয়ে আর বড় কোন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি।  প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে দলীয় ইশতেহারের বাস্তবায়ন ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন করা এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্থায়ী পে-কমিশন গঠনের কাজ ইতিমধ্যে হয়েছে। এর বাইরে ৪৩ বছরের মধ্যে এই প্রথম প্রশাসন সংস্কারের বড় উদ্যোগ হিসাবে সরকারি কর্মচারী আইন করার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে নিয়ন্ত্রিত হলেও ক্ষেত্রবিশেষে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা নিয়োগের নবায়ন চলছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বিশেষ করে সচিব পদে এ ধরনের নিয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র।

গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এরপর থেকে গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান দুই শতাধিক ব্যক্তি। এরমধ্যে রেলওয়ের বিভিন্ন কারিগরি পদ, বিমানের বৈমানিকসহ বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৪১ জন।

অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রায় পাঁচ বছরের শাসনামলে (২০০১ থেকে ২০০৬) সচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ২৮৬ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে উপ-সচিব ও তদূর্ধ্ব পদে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ দশ শতাংশের কোটার যে বিধান আগে থেকে ছিল তা শিথিল করা হয়। শুধু তাই নয়, সংশোধিত বিধানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়াও রাষ্ট্রপতি যে কাউকে যে কোনো পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করতে পারেন।

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১ ) পাঁচ বছরের শাসনকালের শেষ দিন (১৫ জুলাই, ২০০১) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন ৩৭ জন। এর আগে ২০০০ সালে সর্বোচ্চ ৭৭ জন চুক্তিভিত্তিতে নিয়োজিত ছিলেন।
জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে চাকরিতে নিয়মিত যোগ্য কর্মকর্তারা সময়মতো পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কাজ করায় তাদের দক্ষতা, উত্সাহে ভাটা পড়ছে।

১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী অবসর আইনের ৫ (৩) ধারা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা অবসর গ্রহণের পর তাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারতেন। এ আইনের ওপর ভিত্তি করে ১৯৮৯ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এসআরও (নং ২৬১-আইন/৮৯/৯৫ বিধি-২১৭-৭-৮৯) অনুযায়ী সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের প্রতিটি পর্যায়ে ১০ শতাংশ পদে চুক্তিতে বা প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান ছিল। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ১০ শতাংশে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান বাতিল করে।

বিশেষজ্ঞ মন্তব্য: জনপ্রশাসনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, উপযুক্ততা সাপেক্ষে পদ শূন্য থাকলে পদোন্নতির মাধ্যমে সে পদ পূরণ করা যাবে। তবে বিশেষায়িত পদে সব সময় যোগ্য ব্যক্তি পাওয়া যায় না বলে সেসব পদে সীমিতভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যায়। কিন্তু এর অবাধ সুযোগ নেওয়া হলে জনপ্রশাসনে ক্ষোভ অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ একটি উচ্চ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে নিচের পাঁচটি পদের পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ হয়।