ঝুলে আছে কাওরান বাজার স্থানান্তর প্রক্রিয়া

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৯:০১

কাওরান বাজারকে রাজধানীর চারটি স্থানে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নেই। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা কাওরান বাজারের স্থাপনা গিয়ে ঠেকেছে রেললাইনের উপর পর্যন্ত। যার কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। মানুষের চাপে সৃষ্টি হচ্ছে কাওরান বাজার এলাকায় ভয়াবহ যানজট। বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ।
এদিকে কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত আছে কোন মূল্য (সালামি) নেয়া হবে না। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) করপোরেশন অবৈধভাবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে। তারা ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি ১ হাজার ৮০৪টি দোকান নিয়ে করছে বাণিজ্য।

তবে দুই ডিসিসি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বিনামূল্যে দোকান বরাদ্দের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কাওরান বাজারের বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে। মূলত: কাওরান বাজারের বিদ্যমান ব্যবসায়ী ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় বাজার সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দুটি বাজার পুরোপুরি প্রস্তুত ও একটি বাজারের বেশিরভাগ কাজ শেষ হলেও আমলাতান্ত্রিক এই জটিলতার কারণে কাওরান বাজার সরানোর প্রক্রিয়াটি থেমে আছে।  সংশ্লিষ্ট  সূত্রে জানা গেছে, ৩৪ বছর আগে গড়ে উঠা কাওরান বাজার এখন রাজধানীবাসীর কাছে বিষ ফোঁড়া। কাওরান বাজার মানেই এখন যানজট, ময়লা, আবর্জনা, কাঁদাযুক্ত এলাকা। সর্বোপরি এখানে বিরাজ করছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজট। সামান্য বৃষ্টিপাতেই বাজারের অবস্থা আরো অসহনীয় হয়ে উঠছে। রাত দশটার পর শত শত ট্রাক কাঁচামাল নিয়ে কাওরান বাজারে ভিড় করছে। সারা রাত ধরে চলে মাল ওঠানো-নামানো। কাওরান বাজারের এই ব্যস্ততার প্রভাব গিয়ে পড়ে মূল সড়কে, এমনকি রেল লাইন ও তার আশপাশে।

জানা গেছে, কাওরান বাজার এলাকায় রাজউক ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের তালিকাভুক্ত আড়াই হাজার দোকানপাট রয়েছে। তালিকার বাইরে রয়েছে আরো অনেক দোকান। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে যুগে যুগে এসব দোকানপাট গড়ে তুলেছে।

রাজউকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, কাওরান বাজার সংরক্ষণের দায়িত্বভার ডিসিসির ওপর ন্যস্ত করার পরই সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। পরিকল্পনার বাইরে একাধিক দোকানপাট গড়ে তোলা হয়। ফুটপাত দখল হতে থাকে। মূল ভবনের চারপাশে গড়ে তোলে প্রভাবশালীরা অনেক অবৈধ দোকান। এসব স্থাপনা ভাড়া দিয়ে হাতিয়ে নেয়া হয় কোটি কোটি টাকা। এভাবেই বাণিজ্যিক এলাকার মর্যাদা হারাতে থাকে কাওরান বাজার।
যানজট কমাতেই বাজার সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা

রাজধানীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কাওরান বাজারকে ঢাকার চারটি স্থানে সরিয়ে নেয়ার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই চারটি বাজার হল: মহাখালী, আমিন বাজার, যাত্রাবাড়ী ও লালবাগ। তবে লালবাগ প্রকল্পটি পরে স্থগিত করা হয়েছে। তিনটি কাঁচাবাজার ৩৩১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের ২৬ এপ্রিল একনেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, বিদ্যমান কাওরান বাজারের দোকান মালিকদের এই চার বাজারে পুনর্বাসন করা হবে। দোকান বরাদ্দে মূল্য আদায় করা হবে না। অর্থাত্ এখান থেকে প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে না। তবে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের সুবিধা, কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি, বাজারভেদে শাক-সবজি ও কৃষিপণ্যের মূল্য পার্থক্য হ্রাসসহ পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণে সুবিধা পরোক্ষভাবে আর্থিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু সিটি করপোরেশন ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

তিনটি বাজার নির্মাণ প্রায় সম্পন্ন
মহাখালীর বাজারের জন্য ৪টি ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। মোট জমির পরিমাণ ৭ দশমিক ১৭ একর। ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৬০টি দোকান নির্মাণ শেষে বরাদ্দ চলছে। একইভাবে যাত্রাবাড়ী এলাকায় ৫ দশমিক ২১ একর জমিতে আরেকটি কাঁচাবাজার নির্মাণ করা হয়। মোট ৮৯৫টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনেই বেইজমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোর আছে। গাবতলীর আমিন বাজার এলাকায় ১৩ একর জমির উপর কাঁচাবাজার নির্মিত হচ্ছে। ১২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। ইতিমধ্যে চারটি ভবনের প্রায় ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মোট ৫৪৯টি দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। লালবাগের প্রকল্পটি জনসাধারণের চাপের মুখে স্থগিত করা হয়।

চলছে দোকান বাণিজ্য
অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীর বাজারের দোকান বরাদ্দের নামে বাণিজ্য করছে। ১২০ বর্গফুট দোকান ২১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ৩০ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। ফ্লোর অনুপাতে প্রতি বর্গফুটের জন্য নেয়া হচ্ছে ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা। আর কাওরান বাজারের বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাত্র ২০ শতাংশ কম মূল্যে দোকান বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অথচ সরকার বিনামূল্যে এই দোকান বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক ইত্তেফাককে বলেন, বিনামূল্যে দোকান বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। তবে বাণিজ্যের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।

কাওরান বাজারে কারপার্কিংও অপ্রতুল
ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তর) সূত্রে জানা যায়, কাওরান বাজার এলাকায় ৩১টি হাইরাইজ বিল্ডিং রয়েছে। আছে আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা একটি হোটেলও। কিন্তু কারপার্কিংয়ের স্থান সেই তুলনায় কিছুই গড়ে উঠেনি। এছাড়া প্রধান সড়কের উপর যত্রতত্র কারপার্কিং, যেখানে সেখানে মাল উঠানো- নামানোর ফলে কাওরান বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠছে।
উন্নত নগরের আদলে হবে কাওরান বাজার
ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক ইত্তেফাককে বলেন, কাওরান বাজারকে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের আদলে পরিকল্পিত পরিসরে সাজানো হবে। বিলম্বে হলেও কাওরান বাজার আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক রূপ ফিরে পাবে। যানজট নিরসনের মাধ্যমে কাওরান বাজারকে ঐতিহ্যবাহী এলাকা হিসাবে গড়ে তোলা হবে। এতে করে শুধু কাওরান বাজারেরই নয়, গোটা ঢাকা শহরেই যানজট কমে এক সহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হবে। তিনি ইত্তেফাককে আরো বলেন, কৃষিপণ্যের সহজলভ্যতা ও যানজট নিরসনের লক্ষ্যে কাওরান বাজার সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

আগে যেমন ছিল কাওরান বাজার
মোগল আমলে এখানে একটি চৌকি ছিল। শহরে ঢোকার মুখে এ নিরাপত্তা চৌকিতে সবাইকে পরীক্ষা করা হতো। চৌকির সঙ্গে ছিল একটি কাওরান সরাই বা সরাইখানা। খুব সম্ভবত কাওরান সরাই ধীরে ধীরে কাওরান বাজার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ বাজারে এখনো টিকে আছে তিন গম্বুজওয়ালা শায়েস্তাখানি স্থাপত্যের অনুসরণে নির্মিত মসজিদটি, যা একসময় খাজা অম্বরের মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। খাজা অম্বর ছিলেন শায়েস্তা খানের খোজা প্রধান। এটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন ১৬৭৯-৮০ খ্রিস্টাব্দে এবং প্রাচীনতম মসজিদ হিসেবে এর স্থানও অন্যতম। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কালো পাথরের তৈরি মেহরাব, যা আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। খাজা আহসানউল্লাহ মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু জমি ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। মসজিদের পাশেই সমাহিত আছেন খাজা অম্বর। এ মসজিদে যাওয়ার জন্য বর্তমান সোনারগাঁও হোটেলের পাশে খাজা অম্বর একটি পুল নির্মাণ করেছিলেন। তবে ষাটের দশকে রাস্তা প্রশস্ত করার সময় এ পুলটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।