শিবির-পুলিশ-ছাত্রলীগ ত্রিমুখি সংঘর্ষে রুয়েট রণক্ষেত্র

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৯:৩২
 
 
 
বৃহস্পতিবার বিকাল ৫ টার দিকে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির, ছাত্রলীগ ও পুলিশের ত্রিমুখি সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছে। তবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আহতদের কেউ হাসপাতালে যায়নি। গ্রেফতার এড়াতে আহতরা গোপনে চিকিত্সা নিচ্ছে বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার সকালে জামায়াতের হরতালের অজুহাতে ছাত্রশিবির কর্তৃক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি প্রকাশনা উত্সব বন্ধের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে জানা যায়। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রুয়েট ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ মোকাবেলায় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে বহিরাগতসহ অর্ধশতাধিক ছাত্রশিবির নেতাকর্মী রুয়েটে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উপর হামলার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। এখবর পেয়ে নগরীর মতিহার থানার একদল পুলিশ পেছন থেকে শিবিরের ওই দলকে ধাওয়া করে। এ সময় ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং মুহুমূর্ত ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। জবাবে পুলিশ সংঘবদ্ধ শিবির কর্মীদের ওপর টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এদিকে খবর পেয়ে বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিবির কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় ক্যাম্পাসে শিবির, ছাত্রলীগ ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমূখী সংঘর্ষে রুয়েট রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে শিবির কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।    
সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বেলা ৯টা দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। এসময় রুয়েট শাখা শিবিরের সেক্রেটারী আহমেদ ইয়াসিরের নেতৃত্বে একদল শিবির নেতাকর্মী উপস্থিত হয়ে হরতাল চলাকালে সবধরনের কার্যক্রম ১০টার ভেতরে অনুষ্ঠানটি শেষ করতে বলে। কিন্তু অনুষ্ঠানটি চলতে থাকায় বেলা পৌণে ১১টার দিকে রুয়েট শাখা শিবির সেক্রেটারি আহমেদ ইয়াসিরসহ একদল নেতাকর্মী আবারো অডিটরিয়ামে গিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বলে। এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিবিরের সেক্রেটারি ইয়াসির ও তার সহযোগী মামুন অর রশিদকে আটক করে। এসময় তাদের নিকট থেকে ২০টি জিআই পাইপ, একটি চাপাতি ও রেললাইনের পাথরের টুকরা উদ্ধার করা হয়। তবে শিবির এসব উদ্ধার সংক্রান্ত পুলিশের দাবি অস্বীকার করে। 
এ ঘটনার পর দুপুর আড়াইটার দিকে ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত সেলিম হলে ইট-পাথর ও লাঠিসোটা নিয়ে শিবিরকর্মীরা জড়ো হয়। খবর পেয়ে মতিহার থানার ওসি আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ হলটি ঘিরে রাখে। এসময় রুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রাইসুল ইসলাম রোজ ও সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান হিমেলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে জড়ো হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে রুয়েট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে হলে তল্লাশী চালায় পুলিশ। এসময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও হলে প্রবেশ করে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। হলের ভিতরে শিবির নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে গিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভাংচুর করে। এসময় তারা শিবিরকর্মীদের লোহার রড ও লাঠিসোঠা দিয়ে পেটানো শুরু করে। একপর্যায়ে তারা শিবিরকর্মী রাকিবের বাম পায়ে ছুরিকাঘাত করে। এসময় সাংবাদিকরা মারধরের ছবি তুলতে গেলে তাদেরকে বাঁধা দেয়া হয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ক্যামেরা ভাংচুরের হুমকি দেয়। এসময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে। ঘন্টাব্যাপী তল্লাশী শেষে বিকাল ৩টার দিকে ৯ শিবির কর্মীকে আটক করে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। এসময় তারা শিবির নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে পাথর, লোহার রড, শিবিরের ব্যানার, প্রকাশনা সামগ্রী ও একটি ট্রাংক উদ্ধার থানায় নিয়ে যায়।
এদিকে বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে ছাত্রশিবিরের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী সংঘবদ্ধ হয়ে রুয়েটে প্রবেশের চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ ও ছাত্রলীগের সাথে ছাত্রশিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরে সংঘর্ষ রুয়েট সংলগ্ন অক্ট্রয়মোড় ও কাজলায় ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। জবাবে শিবির নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ করে ইট-পাটেকেল নিক্ষেপ ছাড়াও অর্ধশতাধিক শক্তিশালী ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন।
সংঘর্ষে ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের অন্তত ২০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আহতদের কেউই কোনো হাসপাতালে ভর্তি হননি। গ্রেফতার এড়াতে প্রাথমিক চিকিত্সার পর তারা হাসপাতাল ছেড়েছে বলে জানা যায়।  
রুয়েট শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, সকালে রুয়েট মিলনায়তনে সিভিল বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান শুরু হয়। আয়োজকরা হরতালের কারণে অনুষ্ঠান ১০টার মধ্যে শেষ করবে এমনটি জানিয়েছিলো। কিন্তু তারা সাড়ে ১০টার পরও অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছিলো সংবাদ পয়ে শিবির নেতা আহমেদ ইয়াসির সেখানে যান। এ সময় তাকেসহ প্রথমে দুইজনকে ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে অন্যায়ভাবে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের নিকট থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজায়। এরপর তল্লাশীর নামে পুলিশ-ছাত্রলীগ যৌথভাবে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে অন্তত ১৫ জনকে আহত করেছে। এদের মধ্য থেকে শিবির নেতা রাকিবকে পুলিশ হেফাজতে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরে বিকেলে আরো ৩ জন নেতাকর্মীকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ রুয়েটের শাহীন হলে তল্লাশি চালায়। তল্লাশির সময় শিবির নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে জেহাদী বই ও ট্রাং ভর্তি পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। হল থেকে বেশ কয়েকজন শিবিরের নেতাকর্মীদের আটক করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরআগে শিবির সেক্রেটারিসহ ২জনকে আটকের সময় বেশি কিছু পাইপ, একটি চাপাতি ও দুই বস্তা পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। পরে বিকেলে শিবির নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে  ক্যাম্পাসে ঢুকে নাশকতার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান ওসি।
অপরদিকে হরতালের শুরুতেই সকালের দিকে নগরীর কাটাখালি, ডিঙ্গাডোবা দেবীশিংপাড়া ও শালবাগান এলাকায় হরতাল সমর্থকরা পিকেটিংয়ের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। এছাড়া হরতালে ভারি যানবাহন ও বড় দোকানপাট বন্ধ ছিল। তবে রিক্সা, অটোক্সাি ও মোটরসাইকেলসহ হালকা যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল।