সোমবার সারাদেশে আদালত বর্জনের ঘোষণা বার কাউন্সিলের

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ২১:১৮
 
বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া সংক্রান্ত সংবিধানের ১৬তম সংশোধনীর প্রতিবাদে আগামী সোমবার সারাদেশে আদালত বর্জন কর্মসূচীর ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। একইসঙ্গে রবিবার সারাদেশের আদালতে ‘কালো পতাকা প্রদর্শন’ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ দেশের ৬৪টি জেলা বারে এই কর্মসূচি পালন করবে আইনজীবীরা।
শনিবার দেশের বিভিন্ন জেলা বার সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সভা হতে অবিলম্বে সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী বাতিলের দাবি জানানো হয়। সভায় দেশের অধিকাংশ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ অংশ নেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বার কাউন্সিল। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এই সভা চলে। এতে সভাপতিত্ব করেন বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।
তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সংসদের বৈধতার প্রশ্ন যখন প্রশ্নবিদ্ধ, সে অবস্থায় আজ বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা যদি সংসদকে দেয়া হয়, তাহলে উচ্চ আদালতের বিচারকগণ রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হবেন। সরকারের হাতে চলে যাবে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ। বিচারকগণ দলীয় রাজনৈতিক চাপে থাকার কারণে স্বাধীনভাবে বিচারকার্যক্রম পরিচালনা করতে অনেক ক্ষেত্রে সক্ষম হবেন না।
খন্দকার মাহবুব বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা করার বিষয়ে আমরা বারবার দাবি করছি। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা করা হচ্ছে না। ফলে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ঢালাওভাবে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনায় দক্ষতা-যোগ্যতা বিবেচনা না করে বিচারক নিয়োগ করেছে। যার ফলে আজ উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি শুধু ক্ষুণ্ন হয়নি, বিচারপ্রার্থী জনগণের মধ্যেও আস্থার অভাব দেখা দিয়েছে।
বিচার বিভাগের বর্তমান অবস্থা, জেলা বারের সমস্যাসূমহ ও বার কাউন্সিলের করণীয় এবং বার কাউন্সিলের বেনাভোলেন্ট ফান্ডের বিষয়ে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বিভিন্ন বার কাউন্সিলের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা বারের ৩৫ জন প্রতিনিধি বক্তব্য দেন।
সভায় আইনজীবী নেতারা বলেন, সরকার যেভাবে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে তাতে দেশে আইনের শাসন, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র বলে কিছুই থাকবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপরে পড়া এই কালো ছায়া দূর করতে কঠোর কর্মসূচি দিতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে অবশ্যই সেই কর্মসূচি পালন করতে হবে।
সভা শেষে আদালত বর্জন ও কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচির ঘোষণা দেন বার কাউন্সিলের হিউম্যান রাইটস এন্ড লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুবউদ্দিন খোকন।
তিনি বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ মানুষের হূদপিন্ডে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। বিচার বিভাগ দূর্বল হয়ে গেলে গণতন্ত্র, সাংবিধানিক সরকার দূর্বল হয়ে পড়বে। দুর্নীতি-অনিয়ম বাড়বে, আইনের শাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।
সভায় আরো বক্তব্য দেন বার কাউন্সিলের নির্বাচিত নেতা এ জে মোহাম্মদ আলী, গোলাম মোস্তফা খান, তানিয়া আমীর, সানাউল্লাহ মিয়া, কবির চৌধুরী, কাইমুল হক, এ কে এম হাফিজার রহমান ও মো: ইসহাক ছাড়াও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মহসীন আলী মিয়া, টাঙ্গাইল আইনজীবী সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম, সিলেট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী মিন্টু, ফরিদপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি নুরুল আলম, নরসিংদী আইনজীবী সমিরি সভাপতি আমজাদ হোসেন , দিনাজপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম মো: হাবিবুল্লাহ প্রমুখ।
সভা শেষে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। এতে বলা হয়, আদালত অঙ্গণে যে ব্যাপক দুর্নীতি চলছে তা বন্ধে প্রধান বিচারপতি ও আইন মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ, মামলাজট নিরসণে দক্ষ অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য থেকে অতিরিক্ত জেলা জজ নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানানো হয়।
সভায় ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, একদিকে যেমন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলছি, তেমনি জবাবদিহিতার কথাও বলতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আজ দুর্নীতিগ্রস্থ, তাই জবাবদিহিতার জায়গা থাকতে হবে। তবে শুধু সংসদই একমাত্র জবাবদিহিতার জায়গা নয়। জণগণও জবাবদিহিতার জায়গা। তাই বিচারপতিদের জবাবদিহিতা কিভাবে হবে তা আলোচনার বিষয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, প্রমাণিত একটি বিষয়ে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে ঐ প্রমাণিত বিষয়ে কি হবে?