বেসামাল বিএনপি জোট

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১০:৩৫

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েছে। শরিকদের কেউ ছেড়েছে, কেউ ছাড়ার আনুষ্ঠানিক হুমকি দিয়েছে, কেউ গোপনে জোট ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কাউকে জোট থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকটি শরিক দলের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে বিভাজন। অভ্যন্তরীণ কলহ ও দলাদলির জের ধরে এসব দলে ঘটছে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ঘটনা। অন্যদিকে, জোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক জামায়াতকে নিয়ে জোটে সন্দেহ-
অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। সবমিলিয়ে এক ধরনের ভঙ্গুর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে জোট।

তবে নিজেদের জোটে এই পরিস্থিতির পেছনে সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জানা গেছে, জোটের পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই শরিকদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসবেন জোট প্রধান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) এবং শেখ আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে ন্যাপ-ভাসানীর একাংশ এরইমধ্যে জোট থেকে বের হয়ে গেছে। গতকাল জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) একাংশ। এনডিপি’র মহাসচিব আলমগীর মজুমদারের নেতৃত্বে একাংশ দলটির চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার গোলাম মর্তুজাকে বহিষ্কার করেছে। আবার গোলাম মর্তুজাও মহাসচিব পদ থেকে আলমগীর মজুমদারকে পাল্টা বহিষ্কার করেছেন। এছাড়া ইসলামিক পার্টিসহ আরও কয়েকটি খুচরা শরিকের একাংশও গোপনে জোট ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মর্তুজাকে বহিষ্কার করে এনডিপি’র নতুন কমিটি ঘোষণা করেন আলমগীর মজুমদার। নিজেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলীনূর রহমান খান সাজুকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন তিনি। একইসঙ্গে আলমগীর পাঁচ দফা দিয়ে এগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও কার্যকারিতা চেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও জোটকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় এই সময়ের পর তার নেতৃত্বাধীন অংশটি ২০ দল ছাড়বে বলে তিনি জানিয়ে দেন। তিনি জানান, দলের প্রেসিডিয়াম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক গোলাম মর্তুজাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

আলমগীর মজুমদারের নেতৃত্বাধীন এনডিপি’র ঘোষিত পাঁচ দফা হলো- বিএনপি জোটকে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি দিতে হবে, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার অবস্থান থাকতে হবে, পানি সমস্যা সমাধানে ভারতের ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করতে হবে ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে কোনো লুকোচুরি করা যাবে না। জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে এবং ইসলামি বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। পাঁচ দফা দিয়ে তিনি বলেন, জোটের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। জোট থেকে বেরিয়ে গেলে নতুন জোট গঠন করবেন বলেও জানান আলমগীর মজুমদার।

আলমগীর মজুমদারের এই সংবাদ সম্মেলনের পর গোলাম মর্তুজা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আলমগীর মজুমদারকে শুক্রবার রাতেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তার সঙ্গে এনডিপির কোনো সম্পর্ক নেই। নেতা-কর্মীরাও কেউ তার সঙ্গে যায়নি। এনডিপি ঐক্যবদ্ধ থেকে জোটেই আছে, থাকবে।’ তিনি বলেন ‘হয়তো কোনো জায়গা থেকে পয়সা-পাতি পেয়ে আলমগীর এই কাজ করেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে আলমগীর মজুমদার বলেন, ‘ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ঢাকা এলে খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেননি। অথচ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা হোটেলে গিয়ে তিনি অপেক্ষা করেছেন।’ আন্দোলনের কর্মসূচি নেয়ার ক্ষেত্রে শরিক দলগুলোর নেতাদের কোনো মতামত নেয়া হয় না অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘ভারতের বিষয়াদিসহ অন্যান্য বিষয়ে জোট নেত্রীর পক্ষ থেকে যদি সত্ উদ্যোগ কিংবা সমাধান না আসে, তাহলে ২০ দলীয় জোট ৫০ দলীয় জোটে রূপান্তর করেও এই অনৈতিক সরকারকে হটানো যাবে না।’

দুপুরে আলমগীর মজুমদারের সংবাদ সম্মেলনের পর বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ২০ দলের মহাসচিবদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূত্রমতে, ওই বৈঠকে ফখরুল বলেছেন ‘যে কয়েকজন জোট থেকে বের হচ্ছে তারা নিজেরাই রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে। এটা সরকারের খেলা। তবে এই খেলায় কোনো লাভ হবে না।’ এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এই পরিস্থিতি নিয়ে খালেদা জিয়া শিগগিরই জোটের বৈঠক ডাকবেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কাকরাইলের রাজমণি ঈসা খাঁ হোটেলের কনফারেন্স কক্ষে আলমগীর মজুমদারের সংবাদ সম্মেলনে অতিথি সারিতে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া এনপিপি’র একাংশের চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলুু ও মহাসচিব আব্দুল হাই মন্ডল, ন্যাপ-ভাসানীর একাংশের চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ারুল হকও ছিলেন। ২০ দল শরিক ইসলামিক পার্টির একাংশের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ রশীদ প্রধানও সেখানে ছিলেন, এই অংশটিও কিছুদিনের মধ্যেই ২০ দল থেকে বেরিয়ে যাবে বলে জানা গেছে। অবশ্য এডভোকেট আব্দুল মবিন খানের নেতৃত্বে ইসলামিক পার্টির আরেকাংশ ২০ দলেই আছে। এছাড়া গতকালের সংবাদ সম্মেলনে অতিথি সারিতে ২০ দলীয় জোট শরিক লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান সেকান্দর আলী মনিও ছিলেন।

এর আগে গত ২৪ আগস্ট শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্ব এনপিপি’র একাংশ ২০ দল থেকে বের হয়ে যায়। ১১ আগস্ট ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, বৈঠকে এনপিপি চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ পান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। ওই বৈঠকেই খালেদা জিয়া জানিয়ে দেন, নিলু এখন আর ২০ দলে নেই। ফরহাদের নেতৃত্বে এনপিপি’র অপর অংশটি ২০ দলেই রয়েছে। ফরহাদের দলে গতকাল যোগ দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদ, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, প্রিন্সিপাল তসলিমা নাজনিন ও সোলায়মান ঠাকুর। ড. ফরহাদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘যারা জোট থেকে চলে গেছে তারা রাজনৈতিক উচ্ছিষ্ট। বরং সময় থাকতে তারা চলে যাওয়ায় ২০ দল আরও পরিচ্ছন্ন হলো’।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের এক পর্যায়ে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল চারদলীয় জোট সম্প্রসারিত হয়ে ১৮ দলীয় জোট হয়। এরপর ২০ দলীয় জোটে রূপ নেয়।

২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে ৮টি দলের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নেই। এসব দলের কয়েকটি সাইনবোর্ড বা নামসর্বস্ব। ভাঙ্গন আর দলাদলিতে জড়িয়ে পড়া এসব দলকে জোটে সম্পৃক্ত করায় বিএনপির ভেতরে যেমন অস্বস্তি আছে, তেমনি অসন্তোষ রয়েছে জোটের উল্লেখযোগ্য শরিকদের মধ্যেও।

অন্যদিকে, ২০ দলীয় জোটের দ্বিতীয় প্রধান দল জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের ভেতরে দেখা দিয়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাস। সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় রয়েছে জামায়াত—বিএনপি ও জোটের অন্য শরিকদের কারও কারও মধ্যে আগে থেকে এরকম ধারণা জন্মালেও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল বিভাগের রায়ের পর এই সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের দু’তিন মাস পরেই জোট থেকে বেরিয়ে যায় শেখ আনোয়ারুল হকের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী-ন্যাপ)। এরপর গাইবান্ধার আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে মে মাসে ‘ভাসানী-ন্যাপ’ নামে নতুন দল দাঁড় করিয়ে সেটিকে ২০ দলে রাখা হয়। জোটের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে ২০ দল শরিক এলডিপি’র সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি- নামসর্বস্ব এবং সারাদেশে সাংগঠনিকভাবে কোনো অবস্থানই নেই-এমন হুন্ডা পার্টি, টেম্পো পার্টিকে জোটভুক্ত করে লাভ নেই। যারা চলে গেছে তারা না থাকায় বরং ২০ দল বেঁচে গেল।’