আমাকে বন্দী করার আগে পালানোর জন্য প্রস্তুত থাকুন

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১০:৩৪
 ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বিরাট জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আমাকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দীনও ভয় দেখিয়ে ছিল। আমাকে দেশ থেকে বের করতে পারেনি। এই সরকারের গ্রেফতারের হুমকিতে আমি ভয় পাই না। আমাকে বন্দী করার আগে নিজেদের পথ পরিষ্কার করে রাখবেন। পালানোর ভিসা রেডি করে রাখবেন। কারণ তখন পালানোর পথ থাকবে না। জনগণ, দেশের আলেম-ওলামা, সাধারণ মানুষ আপনাদের রাস্তা বন্ধ করে দেবে।
গতকাল মঙ্গলবার সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ঈদের পর যে কর্মসূচি দেয়া হবে তাতে আপনারা সাড়া দেবেন। আমি যেখানেই থাকি আপনাদের সঙ্গেই থাকবো। আমাকে যাই করুক আমাদের দল আছে জনগণ আছে।’ খুন, গুম, দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর মামলা-নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং বিচারকদের অভিশংসনে ক্ষমতা বাতিলসহ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা ২০ দলীয় জোট এ জনসভার আয়োজন করে।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘অভিসংশন আইন বাতিল করতে হবে। বিচারপতিদের ভয় দেখানোর জন্যই এ আইন করা হয়েছে। বিচারকদের হাত বেঁধে দেয়া হয়েছে। এই আইন বাতিল না করলে একদিন হরতাল নয়, যে কোনো কর্মসূচি দিতে আমরা প্রস্তুত। ২০ দলীয় জোট শক্তিশালী হচ্ছে এমন দাবি করে তিনি বলেন, ‘২০ দলীয় জোট ভাঙবে না, শক্তিশালী আছে। যারা দেশ প্রেমিক তারা এই জোটে আছেন। তারা কখনও দালালদের সঙ্গে যেতে পারেন না। তারা এই দুর্দিনে বেশি ঐক্যবদ্ধ হবেন।’
খালেদা জিয়া বলেন, বিচার বিভাগের কোনো স্বাধীনতা নেই, সরকার যা বলে সেই ভাবেই রায় দিতে হয়। সংবিধানের নতুন সংশোধনীর ফলে এখন বিচার বিভাগকে ভয় দেখিয়ে সরকার রায় করাবে। সরকারের পছন্দ মত রায় না দিলে অভিশংসন আইনে বিচারকদের অপসারণ করাবে।
দুর্নীতি ও লুটপাটের জন্য এ সরকারকে কাঠগরায় দাঁড়াতে হবে এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ মানে হাটি হাটি খাই খাই, যা পাই তাই খাই’।
তিনি বলেন, জামায়াতকে এখন অপবাদ দেয়া হচ্ছে তারা নাকি খারাপ। অথচ এরা এক সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল। জামায়াত ছিল তাদের বন্ধু। তখন জামায়াত ছিল স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি। আর এখন তারা হয়ে গেছে রাজাকার। এদের নাম আওয়ামী লীগ।
বিএনপি প্রধান বলেন, ‘শুধু আলেম বা মুসলমান নয় আওয়ামী লীগের হাতে কোনো ধর্মের লোকই নিরাপদ নয়। কক্সবাজারের বৌদ্ধদের ওপর তারা হামলা চালিয়েছে। আগুন দিয়ে তাদের উপসানালয় পুড়িয়ে দিয়েছে। সারা দেশের হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর জুলুম নির্যাতন করছে। তাদের মন্দির দখল করা হচ্ছে।’
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা যাতে প্রকাশ না হয়, জনগণ যাতে জানতে না পারে সেজন্য সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে অবৈধ সমপ্রচার নীতিমালা করা হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। বিদ্যুতের উত্পাদন নিয়ে জনগণকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। কুইক রেন্টালের নামে জনগণের টাকা লুট করছে সরকার।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জড়িত। তিনি কীভাবে পদে থাকেন। তাকে ধরলেই সব বেরিয়ে যাবে, তাই তাকে ধরা হচ্ছে না। তার বিচার করতে হবে।’
পুলিশ প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিরপেক্ষ ব্যবহার করবেন। অন্যায়ভাবে মিছিল-মিটিংয়ে গুলি চালাবেন না। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে দেখিয়ে দিতে চাই, জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। তরুণদের এ অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আন্দোলন করতে হবে, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।’
খালেদা জিয়া তার নামে হওয়া মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় কত মামলা হয়েছিলো। আমাদের নামেও হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দলের নেতাদের মামলা তুলে নিয়েছে। আমাদের মামলা তোলেনি। এখন ভয় দেখায় গ্রেফতারের। কিন্তু আমি গ্রেফতারের ভয় পাই না। ওয়ান ইলেভেনের সময় তারা আমাকে দেশের বাইরে পাঠাতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমি যাইনি। এ দেশের মাটি ও মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।
বেগম খালেদা জিয়া বেলা সাড়ে ১১টায় গুলশানের বাসভবন থেকে জনসভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নয়াপল্টন, যাত্রাবাড়ী হয়ে স্থানীয় সার্কিট হাউজে পৌঁছান। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর জনসভা মঞ্চে উপস্থিত হন। তিনি প্রায় ৪৫ মিনিট বক্তব্য রাখেন।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, আব্দুল্লাহ আল নোমান, জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, খেলাফত মজলিশের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহম্মদ ইসহাক, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, জাগপার সভাপতি সফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি আব্দুল লতিফ নেজামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্তজা, এনপিপির চেয়ারম্যান ডা. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, এলডিপির মহাসচিব ডা. রেদওয়ান আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান আবুল হাসানাত আমিনী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুত্ফর রহমান, বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমেদ, ডিএল’র সাধারণ সম্পাদক সাঈফুদ্দিন মনি প্রমুখ।
জনসভার মাঠ এবং সন্নিহিত শহরের বিশাল অংশ জুড়ে ছিল মানুষের ঢল। খালেদা জিয়ার সফর উপলক্ষ্যে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অবধি সড়কের স্থানে স্থানে নেতা-কর্মীরা শ্লোগান দেয়। সফর উপলক্ষ্যে ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ তৈরি করা হয়েছিল।