টিকিট দিতে ধীরগতি, ভোগান্তি আর ঘরমুখীদের উপচে-পড়া ভিড়ের মধ্য দিয়ে ঈদ ও পূজায় ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শুক্রবার বিক্রি হয় ১ অক্টোবরের টিকিট। সকাল ৯টা থেকে অগ্রিম টিকেট দেয়া শুরু হলেও ঘরমুখো মানুষের দীর্ঘ সারি শুরু হয় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে। রাত যত বাড়ে টিকেটপ্রত্যাশী মানুষের লাইন তত দীর্ঘ হয়। আর সকাল থেকেই কমলাপুর রেলস্টেশনে টিকিটের আশায় দীর্ঘ লাইন। টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি কাউন্টারের সামনে অপেক্ষমাণ লোকদের সারি আঁঁকাবাঁকা হয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর টিকেট পেয়ে অনেককে হাসিমুখে ফিরতে দেখা গেছে। শনিবার বিক্রি হবে ২ অক্টোবরের টিকিট। এই দিন থেকে ট্রেনের টিকিটের জন্য মাত্রারিক্ত চাপ থাকবে বলে মনে করছে রেলওয়ে।
ঈদের সময় মহাসড়কে যানজট, দুর্ঘটনা ও নানা দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ট্রেনের টিকিটের প্রতিই নগরবাসীর ঝোঁক বেশি থাকে। অন্যান্য বারের তুলনায় এবারের ঈদ ও পুজায় বিভিন্ন রুটের প্রতিটি ট্রেনেই যাত্রীর চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। কালোবাজারী রোধে স্টেশনে ১৬টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) বসানো হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশ বিশেষভাবে টিকিট বিক্রির ভিডিও করছে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, টিকিটের জন্য প্রায় প্রতিটি কাউন্টারের সামনেই লম্বা লাইন। তবে রেলওয়ে পশ্চিমের তুলনায় পূর্বের টিকিটের চাহিদা অনেক কম। টিকিটের সবচাইতে বেশি চাহিদা রাজশাহী, দিনাজপুর, ঢাকা, খুলনার কাউন্টারগুলোতে। টিকিট কিনতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম দিনের টিকিট বিক্রি কার্যক্রম নিয়ে তারা মোটামুটি সন্তুষ্ট হলেও ক্ষোভ রয়েছে টিকিট বিক্রির ধীরগতি নিয়ে। এ ছাড়া, অনেকেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) আসন ও বার্থ টিকেট না পাওয়ায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। অনেকেই বলেছেন সকাল থেকে লাইনে দাঁড়ালেও তাদের এসির টিকিট দেয়া হচ্ছে না। ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনেকে টিকেট পাননি। এরই মধ্যে সকাল ১০টার দিকে টিকিট বিক্রি কার্যক্রম পরিদর্শন করতে আসেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মনসুর আলী সিকদার, রেলওয়ের মহাপরিচালক তফাজ্জল হোসেনসহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা টিকিট বিক্রির কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তবে কোনোভাবেই যাতে টিকিটের কালোবাজারি না হয়, সে বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেন তারা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেও দালালরা যাত্রীদের মধ্যে ঢুকে ২০ টাকা করে নিয়ে দীর্ঘ লাইনের অগ্রভাগে সিরিয়াল করে দেয়ার অভিযোগও করেছেন যাত্রীরা। ধীরগতিতে টিকিট দেয়ারও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। রংপুরগামী মহিদুল্লাহ গালিব, মোস্তাফিজুর রহমান ও মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে জানান— টিকিট কাউন্টার থেকেও ধীরগতিতে টিকিট দেয়া হচ্ছে। এ জন্য দীর্ঘ লাইন যেন শেষ হচ্ছে না।
টিকিট বিক্রির ধীরগতি নিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মো. খায়রুল বশীর জানান— টিকিট বিক্রিতে জনপ্রতি অন্তত তিন থেকে চার মিনিট সময় লাগছে। কারণ অনেকের কাছে টাকা খুচরা থাকে না, অনেকেই আবার ভুল লাইনে এসে পড়েন— এ রকম বিভিন্ন কারণে সময় একটু বেশি লাগছে। আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি, যাতে সল্পসময়ে টিকিটি যাত্রীদের হাতে তুলে দেয়া যায়। এসি কামরার টিকিটের ব্যাপারে তিনি বলেন, তবে আগামী কাল থেকে অগ্রিম টিকিটের ভিড় বাড়বে।
টিকিট বিক্রির ধীরগতি নিয়ে অনেকের অসন্তুষ্টি থাকলেও টিকিটের কালোবাজারির বিষয় নিয়ে কারো অভিযোগ নেই। আগাম টিকিট বিক্রি উপলক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও কালোবাজারি রোধে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি), রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র্যাব) তিনটি বুথ চালু করা হয়েছে। এই তিনটি বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। যাত্রীদের কোনো বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তা জানাতে মাইকের মাধ্যমে অনুরোধ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মজিদ জানান— এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই টিকিট বিক্রি কার্যক্রম চলছে। টিকিটের কালোবাজারি রোধ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো রকমের ছাড় দেয়া হবেনা।
কমলাপুর স্টেশনে মোট ১৫টি কাউন্টারে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ হাজার আগাম টিকেট বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছে রেল কতৃপক্ষ। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন এক লাখ ৮০ হাজার টিকেট বিক্রি হলেও ঈদ ও পূজা সামনে রেখে এবার প্রতিদিন সব ট্রেন মিলিয়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টিকেট বিক্রি করা হবে। প্রতিবারের মতো এবারও একজনকে চারটির বেশি টিকিট দেয়া হচ্ছে না।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব দুুর্গাপূজা উপলক্ষে বিজয়া দশমীর ছুটি আগামী ৪ অক্টোবর। এর এক দিন পর ৬ সেপ্টেম্বর মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উত্সব ঈদুল আযহা। ৫ থেকে ৭ অক্টোবর ঈদের ছুটি হলেও ৩-৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে। শুক্রবার প্রথম দিন কমলাপুর থেকে ঈদের ৫ দিন আগের টিকেট বিক্রি হয়েছে।
রেল মহাপরিচালক তফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন— ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে ১ থেকে ৫ অক্টোবরের টিকেট বিক্রি হবে। ২৭ সেপ্টেম্বর পাওয়া যাবে ২ অক্টোবরের টিকিট, ২৮ সেপ্টেম্বর ৩ অক্টোবরের, ২৯ সেপ্টেম্বর ৪ অক্টোবরের এবং ৩০ সেপ্টেম্বর পাওয়া যাবে ৫ অক্টোবরের টিকিট। আর ৩ অক্টোবর পাওয়া যাবে ৭ তারিখের ফিরতি টিকিট।
তিনি আরো জানান, অগ্রিম টিকেট বিক্রি ছাড়াও ঈদুল আযহা উপলক্ষে যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে রেলওয়ের ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে যাবে। এ সময় ৬৫টি ট্রেন দিনে দুইবার করে যাতায়াত করবে। এতে প্রায় ৪৮ হাজার যাত্রীর সেবা দেয়া সম্ভব হবে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার অগ্রিম টিকেটের সেবা পাবেন যাত্রীরা।
ঈদ উপলক্ষে রেলওয়ের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয় শুধু ঢাকার কমলাপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেট স্টেশনে। ফিরতি টিকিট এই তিন স্টেশন ছাড়াও রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্রি হবে। প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার অগ্রিম টিকিট বিক্রি হবে বলে রেল কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
ই-টিকিটিং নিয়ে প্রচারণা নেই:
রেলের ইলেক্ট্রনিক টিকেটিং (ই-টিকেটিং) সেবা সম্পর্কিত প্রচার-প্রচারণা নেই। এ জন্য ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করতে আসা সাধারণ যাত্রীরা। কমলাপুর রেল স্টেশনে টিকিট নিতে আসা যাত্রীদের এ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।
যাত্রীরা জানান— স্টেশনে দেখা যাচ্ছে মোবাইল টিকেটিং কাউন্টার। অন্য কাউন্টারগুলোতে উপচে-পড়া ভিড় থাকলেও ই-টিকেটিং মোবাইল কাউন্টার একেবারে ফাঁকা। লাইনে না দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ই-টিকেটিংয়ের মাধ্যমে মোবাইল কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন যাত্রীরা।
রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মো. খায়রুল বশীর রেলের ই-টিকেটিং সম্পর্কে অনেকে অবগতি আছেন উল্লেখ করে বলেন, রেলের ই-টিকেটিংয়ের মাধ্যমে অনেকে টিকিট সংগ্রহ করছেন। তবে সংখ্যাটা কিছুটা কম।
