ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার কোটি টাকা লোপাট !

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ২১:০৯
 
দেশের চারটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ করার অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ী ওয়াহিদুর রহমানের নামে। তার এ আত্মসাতের ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে ধরা পড়লে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ সংক্রান্ত নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়। সম্প্রতি কমিশনের বৈঠকে এ অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ দুর্নীতি অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে কমিশন। দুদকের উপপরিচালক মো. জুলফিকার আলীর নেতৃত্বাধীন এই টিমের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক মো. মশিউর রহমান ও উপসহকারী পরিচালক ওমর ফারুক। শিগগিরই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানে ঋণ জালিয়াতির বিভিন্ন নথি তলব করা হবে।
দুদক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া তথ্য মতে ব্যবসায়ী ওয়াহিদুর রহমান বিভিন্ন সময় দেশের চারটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা নিয়ে আত্মসাত্ করেছেন। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংক থেকে ৭৬৭ কোটি টাকা, ইসলামিক আইসিবি ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ১২৪ কোটি, সিটি ব্যাংক থেকে ছয় কোটি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি থেকে দুই  কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর বেশির ভাগ টাকাই তিনি ঋণ নিয়েছেন ভুয়া ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে। ব্যাংকের ঋণের নথিতে উল্লেখিত ঠিকানার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। এ ছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ঋণ বিতরণে সিআইবির ছাড়পত্র না নেয়া, ঋণের নথি যাচাই না করা, গ্রাহকের কেওয়াইসি (তোমার গ্রাহককে জানো) পূরণ না করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে এ সব ঋণ আদায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
দুদকে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথি থেকে জানা গেছে, সাবেক ওরিয়েন্টাল ব্যাংক বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক থেকে ২০০৪ সালের দিকে তিনি ব্যাংকের বংশাল শাখা থেকে প্রায় শত কোটি টাকা নিয়ে আত্মসাত্ করেন। বিভিন্ন ধরনের ১০টি প্রতিষ্ঠানের নামে ওই শাখা থেকে শতাধিক কোটি টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি। ওয়াহিদুর রহমান ওরিয়েন্টাল ব্যাংক থেকে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ, পলাশ এন্টারপ্রাইজ, রত্না এন্টারপ্রাইজ, মাসুদ ট্রেডিং, ইউনাইটেড ট্রেডিং, অটো ডিফাইন, ওয়েস্টার্ন গ্রিল, ডেং ডি লায়ন রেস্টুরেন্ট, ফিয়াজ ট্রেডিং ও আলী ট্রেডিংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়েছেন। কাগজপত্রে এ সব প্রতিষ্ঠানের মালিকের ভিন্ন ভিন্ন নাম হলেও প্রকৃত মালিক ওয়াহিদুর রহমান বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ সব ঋণের জন্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমেদ, আলী আশরাফ, আশফাক হোসেন— এ সব নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ ওয়াহিদুর রহমানের একটি প্রতিষ্ঠান হলেও এর মালিক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনকে দেখানো হয়েছে। এ সব প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী ওয়াহিদুর রহমান।
এ ছাড়া, বেসিক ব্যাংক থেকে এখন পর্যন্ত নামে-বেনামে তার বিরুদ্ধে ৭৬৭ কোটি টাকা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের দিলকুশা, শান্তিনগর এবং গুলশান— এই তিন শাখা থেকেই ওয়াহিদুর রহমান নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছেন। তার অটো ডিফাইন নামের প্রতিষ্ঠানকে শান্তিনগর শাখা থেকে ২৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ওই ঋণ তিনি পরে সিআর এন্টারপ্রাইজের নামে হস্তান্তর করেন। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই মালিক ওয়াহিদুর রহমান। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন নাম দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এই ঋণকে খেলাপি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এবি রাশেদ নামে ওয়াহিদুর রহমানের এক কর্মচারীকে মালিক বানিয়ে এবি  ট্রেড লিংক নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। এর নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয় ৬৭ কোটি টাকা। এ সব ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
মা টেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গুলশান শাখা থেকে ঋণ  নেওয়া হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। অটো ডিফাইন ঋণখেলাপি হওয়ার পর নিউ অটো ডিফাইন নামে আরো একটি প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। অটো ডিফাইনের মালিকানা ওয়াহিদুর রহমান ছেড়ে দিয়ে আসমা খাতুন নামের এক মহিলাকে এর মালিকানা দেন। নিউ অটো ডিফাইনের মালিকানা নেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের নামে শান্তিনগর শাখা থেকে ৯০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের নামে শান্তিনগর শাখা থেকে ১৫২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
এ দিকে, ওয়াহিদুর রহমানের কর্মচারী রাসেলের নামে সিটি ব্যাংক থেকে প্রায় ছয় কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে হলোগ্রাম ইন্ডাস্ট্রিজের নামে পাঁচ কোটি ও তার কর্মচারী এবি রাশেদের নামে খোলা অপর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা। দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
অপর দিকে কৃষি ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে ওয়াহিদুর রহমানের নামে-বেনামে তিনটি প্রতিষ্ঠান ১২৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাত্ করেছে। এর মধ্যে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের নামে ৫৪ কোটি ৫৮ লাখ, অটো ডিফাইনের নামে ৩৬ কোটি ৪৭ লাখ এবং ফিয়াজ ট্রেডিংয়ের নামে ৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। সব ঋণই এরই মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
ফিয়াজ গ্রুপেরে অনুকূলে ব্যাংক কোম্পানি আইন লংঘন করে ১৫২ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়। ২০১১ সালের ২০ এপ্রিলের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে ঋণটি পরিশোধিত হয়নি এবং নবায়নও করা হয়নি। ফলে পুরো ঋণটি আদায়-অযোগ্য মন্দ ঋণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণটি আদায়ের ব্যাপারে জোরালো কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, প্রকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ ও তদারকির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি থেকে ওয়াহিদুর রহমানের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামে নেওয়া ঋণের মধ্যে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে অটো ডিফাইনের নামে এক কোটি ৯৩ লাখ ও বাকি ৪৭ লাখ টাকা নিজের নামে নেওয়া হয়েছে।