কালোবাজারে পাওয়া যাচ্ছে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট। ঈদ-পূজাকে সামনে রেখে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা টিকিট কালোবাজারে ছেড়েছেন। ফলে যারা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পাচ্ছেন না তারা অতিরিক্ত মূল্যে কালোবাজার থেকে টিকিট সংগ্রহ করছেন। গতকাল ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির চতুর্থ দিনে বেশ সক্রিয় ছিল এই চক্র।
এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ‘টিকিট কালোবাজারে এটা ঠিক নয়। তবে শুধু ভিআইপিদের নয়, বিপদে পড়লে সাধারণ মানুষকেও রেলের টিকিট দেয়া হয়। মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন আমাদের সচিব ও কর্মকর্তাদের কাছে আসে, তখন কিছু টিকিট দেয়া হয়।’
রেলওয়ে সূত্র জানায়, অগ্রিম টিকিট বিক্রির সময় যারা লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট কাটতে পারেননি তাদের জন্য শুধু যাত্রার দিন ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ আসনবিহীন টিকিট বিক্রিয় করা হবে। আগামীকাল থেকে অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরা স্ব-স্ব ট্রেনে যাত্রা শুরু করবেন। একই সাথে আজ মঙ্গলবার ৫ অক্টোবরের টিকিট বিক্রির মধ্যে দিয়ে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হচ্ছে আজ। অগ্রিম টিকিট বিক্রিকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই স্টেশনে ছিল উপচেপড়া ভিড়। নিরাপদে বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করতে আগের রাত থেকেই স্টেশনে অবস্থান করছেন যাত্রীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টিকিট না পেয়ে কালোবাজার থেকে টিকিট নিয়েছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। তাদের মধ্যে একজন মিরপুরের বেসরকারি ফার্মে কর্মরত মিজানুর রহমান। তিনি রবিবার বিকাল ৫টা থেকে কমলাপুর স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সপরিবারে গ্রামের বাড়ি রংপুরে যাবেন তিনি। সোমবার সকাল নয়টায় ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির ১৬ ঘন্টা পূর্বেই হাজির হয়েছিলেন স্টেশনে। তার সামনে ছিলেন আরো ৪ শতাধিক যাত্রীর সিরিয়াল। গতকাল সকাল ৯টা থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হবার পর যখন তিনি কাউন্টারে পৌঁছেছেন তখন বেজে গেছে বেলা ২টা। কাউন্টারে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট চাইলে কাউন্টার থেকে জানিয়ে দেয়া হয় আর কোন আসন খালি নেই।
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মিজানুর রহমান শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে যান খালি হাতে। পরে কোন উপায়ান্তর না দেখে জালিয়াত চক্রের সাথে যোগাযোগ করে অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা দিয়ে ৪টি টিকিট ক্রয় করে বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করেন।
এভাবেই প্রতিদিন হাজার হাজার টিকিট প্রত্যাশীকে ফিরতে হচ্ছে টিকিট ছাড়াই। পরে বিভিন্নভাবে জালিয়াত চক্রের সাথে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করছেন টিকিট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অগ্রিম টিকিট বিক্রির নামে বাণিজ্য করছেন রেলওয়ে বিভাগের কিছু কর্মকর্তা। কালোবাজারিদের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে নিজেরাই গোপনে টিকিট ইস্যু করে নিচ্ছেন। এছাড়াও কাউন্টারের ভেতর থেকে দেয়া হচ্ছে ভিআইপিদের টিকিট। ফলে যে পরিমাণ লোক থাকছেন তাদের অনেকেই টিকিট পাচ্ছেন না।
মতিঝিলে কর্মরত ব্যাংক কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় রেলস্টেশনে অপেক্ষা করেও অনেক সময় টিকিট পাওয়া যায় না। তাই আর কাউন্টারের টিকিটি ক্রয়ের বৃথা চেষ্টা করি না। সেখানকার একজন নিরাপত্তাকর্মীর সাথে যোগাযোগ আছে। তাকে অতিরিক্ত টাকা দিয়েই টিকিট নিয়েছি। এতে কিছু টাকা বেশি খরচ হলেও সময় সাশ্রয় হয়েছে।’
যাত্রীদের এসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকলে অগ্রিম টিকিট বিক্রির চতুর্থ দিনে গতকাল সকালে কমলাপুরে টিকিট বিক্রি পরিদর্শনে আসেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, রেলের উন্নয়নে খুব শিগগিরই ২৭০টি নতুন কোচ রেলবহরে যোগ হচ্ছে। ভিআইপিদের জন্য নির্ধারিত ৫ শতাংশ কোটার বাইরে টিকেট দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগ সঠিক না। বিদ্যমান কোটার বাইরে কোনো টিকেট বিক্রি করা সম্ভব নয়। তারপরও আপনারা সাংবাদিক বন্ধুরা বলেন বাড়ি যাবো, বলেন টিকেট দেন, এভাবে কিছু টিকেট দিয়ে থাকি। মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন আমাদের সচিব ও কর্মকর্তাদের কাছে আসে, শুধু ভিআইপিদের টিকেটের ব্যবস্থা করা হয় একথা ঠিক না। দেশের সাধারণ নাগরিক যখন বিপদে পড়ে আমার কাছে আসেন, যদি সুযোগ থাকে তবে আমরা কাউকে ফিরাই না।’
এবার এসি আসন ও বার্থ টিকেট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে টিকেট প্রত্যাশীদের। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘অভিযোগ থাকতে পারে। আমাদের সম্পদ সীমিত, দাবি বেশি। চাহিদা অনুযায়ী আসন দেয়া যাচ্ছে না।’
ঈদ-পূজায় রেলযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে রেলমন্ত্রী বলেন, যাত্রীরা যেন নিরাপদে আসতে ও যেতে পারেন তা আমরা নিশ্চিত করতে চাই, সীমিত সম্পদ দিয়ে অতিরিক্ত যাত্রীদের সেবা করতে চাই। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ছুটি আগেই বাতিল করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ টিকিট বিক্রি হচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহনে স্পেশাল ট্রেন ও অতিরিক্ত ১৩০টি কোচ রাখা হয়েছে। যাত্রীদের জন্য এ কোচগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সংযোজন করা হবে।
কোচ ও ইঞ্জিনের স্বল্পতা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এরমধ্যে ৪৬টি ইঞ্জিন এসেছে। শিগগিরই আরো ৭০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হবে। বর্তমানে রেলের উন্নয়নে ৪১টি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া ১২০টি নতুন কোচ ভারতীয় অর্থায়নে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং এডিবির অর্থায়নে ১৫০টি কোচ অর্থাত্ মোট ২৭০টি নতুন কোচ নিয়ে আসা হচ্ছে। কাউন্টারে টিকিট বিক্রির ধীর গতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, রেলে লোকবলের অভাব রয়েছে, অলস লোকদের সরিয়ে কাউন্টারগুলোতে দক্ষ লোক নেয়া হবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মনসুর আলী সিকদার, রেলওয়ের মহাপরিচালক তফাজ্জল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
