২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

আদালতে সাক্ষ্য দিলেন জজ মিয়া

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৯:৫৩
 
 
 
 
 
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন বহুল আলোচিত সেই জজ মিয়া। সাক্ষ্যে তিনি দাবি করেন, ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে তাকে ‘সাজানো জবানবন্দি’ দিতে বলা হয়। অন্যথায় তাকে ‘ক্রসফায়ারে’ এবং তার পরিবারের সদস্যদেরকে মেরে হুমকি দেয়া হয়। তিনি আরো দাবি করেন, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে ঐ সময় তিনি সাজানো সাক্ষ্য দিতে রাজি হন।
মঙ্গলবার ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন এই জবানবন্দি নেন। চাঞ্চল্যকর এ মামলার ১০৪ তম সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন জালাল আহমেদ জজ মিয়া। সাক্ষ্যগ্রহণে সহায়তা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান।
এদিকে জজ মিয়াকে সাক্ষী হিসেবে গ্রহণে আপত্তি জানিয়ে তার জবানবন্দি বাতিলের দাবি জানিয়েছে আসামি পক্ষ।
আসামি উজ্জ্বল ওরফে রতনের আইনজীবী মোহাম্মদ আলী আবেদনে বলেন, ‘জজ মিয়া এই মামলার আগের অভিযোগপত্রে আসামি ছিলেন, তিনি ১৬৪ ধারায় বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তাই সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, তার জবানবন্দি প্রত্যাহার করা হোক।’ বিচারক আবেদনটি গ্রহণ করে আগামী ১৩, ১৪ ও ১৫ অক্টোবর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রেখেছেন।
সাক্ষ্যে জজ মিয়া বলেন, ‘‘২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সময় আমি নোয়াখালীর সেনবাগের গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। ঐ দিন সন্ধ্যায় গ্রামের একটি চায়ের দোকানের টেলিভিশনে গ্রেনেড হামলার খবর দেখতে পাই। আমি রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকায় থাকতাম আর গুলিস্তানে সিডির ব্যবসা করতাম। গ্রেনেড হামলার পর আমি ঢাকায় ফিরে আসি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাই। ওষুধ কেনার জন্য বাজারে যাওয়ার পথে গ্রামের মোকছেদ চৌকিদারের সঙ্গে দেখা হয়। মোকছেদ চৌকিদার আমাকে বলেন, ‘তুমি চোরাচালানির ব্যবসা করো। তোমার নামে ওয়ারেন্ট আছে। তোমাকে থানায় যেতে হবে।’ এরপর মোকছেদ চৌকিদারের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেলে করে সেনবাগ থানায় যাই। পরবর্তীতে থানার এসআই রফিক আমাকে জানান, এই থানায় আমার নামে কোনো মামলা নেই। ঢাকা থেকে এক মামলায় তোমার নামে ওয়ারেন্ট আছে। এরপর ঢাকা থেকে এসপি রফিক সাহেব নোয়াখালীর সেনবাগ থানায় যান। সে সময় এসপি রফিক থানায় উপস্থিত অন্য কর্মকর্তাদের বের করে দেন এবং আমার চোখ ও হাত বেধে ফেলেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘তুমি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলা করেছ।’ তখন আমি বলেছি, না স্যার আমি ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানি না। একথা বলার পর তিনি আমাকে মারধর করেন। এসপি বলেন, ‘তুই যদি এটা স্বীকার না করিস, তাহলে অন্য মামলায় আসামি করে তোকে ক্রসফায়ারে দিয়ে দেবো।’ এরপর চোখ বন্ধ অবস্থায় আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় আসার পর চোখ খুলে আমি দেখি, সাদা পোশাকধারী পুলিশ। তাদের কাছ থেকে জানতে পারি, এটা মালিবাগের সিআইডি অফিস।’’
জজ মিয়া আদালতে বলেন, সিআইডির কার্যালয়ে এনে আমাকে সাজানো জবানবন্দি দিতে বলা হয়। অন্যথায় আমাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে এবং পরিবারের সদস্যদেরকে মেরে ফেরার হুমকি দেওয়া হয়। তখন সিআইডর কর্মকর্তারা আমাকে বলেন, এই মামলায় তোমাকে রাজসাক্ষী করা হয়েছে, আমার ফ্যামিলি তারা দেখবেন। এরপর একদিন আমাকে এসপি রুহুল আমিনের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আমাকে বলেন, আমাদের কথা মতো কাজ করলে তুই ও তোর পরিবারের ফলাফল ভালো হবে। তারপর আমি তাকে বললাম, স্যার আমাকে আসামি করছেন? তখন তিনি বললেন, না তোকে রাজসাক্ষী করছি। তোর নামে আরও মামলা আছে। কথা না শুনলে ওইসব মামলায় ঢুকিয়ে দেবো। তারপর এসপি রুহুল আমিন বলেন, আমাদের কিছু করার নেই, এটা উপরের নির্দেশ। এরপর জজ মিয়া বলেন, আমি, আমার মা-বাবা, বোনকে বাঁচাতে তাদের কথায় রাজি হয়ে যাই।
তিনি দাবি করেন, আমাকে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার অনেক ভিডিও দেখানো হয়। তারা বলেন, আমরা যা শেখাবো, আদালতে তাই বলবি। এরপর মামলার শুনানির তারিখ চলে আসে। এর মধ্যে একদিন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুন্সী আতিক আমাকে বলেন, যা তোমাকে বলা হয়েছে, তা ঠিক আছে তো। এরপর তিনি আমাকে দিয়ে অনেকের নাম বলান যাদের নামে দুই চারটি মামলা আছে। তিনি বলেন, তোর নামে এর আগে যে মামলা আছে, চালানোর দায়িত্ব আমাদের। মুন্সী আতিক বলেন, ওপর থেকে চাপ আছে এ নির্দেশে কাজ করছি। জজ মিয়া বলেন, সিআইডি অফিসে আমাকে রেখে  গ্রেনেড হামলার বিষয়ে অনেক ঘটনা মুখস্ত করান। এরপর একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আমাকে কোর্টে নিয়ে যান। কোর্টে নেওয়ার আগেও তিনি আমাকে বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো?
জজ মিয়া বলেন, সিআইডি অফিসে থাকাকালে আমি সেনবাগের ওসির কাছে ফোন করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতাম। এ সময় আমাকে বলা হয়, আমরা তোমার মা বাবাকে এ মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত খাওয়াবো। এরপর আমার নামে আগে যে মামলা আছে সেই মামলায় আমাকে কারাগারে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই কারাগারে মুন্সী আতিক ও রুহুল আমিন দুইজনেই যান। তারা আমাকে বলেন, আমাদের ভুলে যেও না, আর কিছু লাগলে আমাদের বলিও। এরপর একদিন কর্নেল গুলজার, রুহুল আমিন জেলগেটে আসেন। কর্নেল গুলজার আমার কাছে জানতে চান, কি ঘটনা? তখন গুলজার সাহেবকে বলি, আমি এ গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে জানি না। আমাকে যেভাবে শেখানো হয়েছে, আমি সেভাবে বলেছি। তখন গুলজার মুন্সী আতিককে বলেন, আর কতো নিরীহ মানুষের জীবন নষ্ট করবে? গুলজার সাহেব চলে যাওয়ার আগে আমাকে বলে যান, তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবো।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৫ সালে জজ মিয়াকে আটক করে বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানো হয়। ২০০৮ সালে তাকে আসামি থেকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। পরে আদালত এ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া।