হঠাত্ এলোমেলো করে দিলেন লতিফ সিদ্দিকী

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৪, ১৫:৩৯
 মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও পবিত্র হজ্বের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে হঠাত্ সবকিছু এলোমেলো করে দিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। পাঁচ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এই পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলতে গেলে শান্ত বা স্থিতিশীলই ছিল। আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ অন্য একটি ইস্যু সৃষ্টি করে তিনি গোলমাল পাকিয়ে দিলেন। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু করে ধাপে-ধাপে আজকের এই অবস্থানে উঠে আসা লতিফ সিদ্দিকী আজ যেন অন্যকেউ। তিনি কেন সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে এমন মন্তব্য করলেন? এর নেপথ্য রহস্য কি? দেশের আনাচে-কানাচে, অলি-গলিপথে সব মহলে এখন এই জিজ্ঞাসা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, লতিফ সিদ্দিকীর যে বক্তব্য নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সেটি ‘রাজনৈতিক’ তো নয়ই, এটিকে ‘অরাজনৈতিক’ ইস্যু বলেও অভিহিত করা যায় না। একেবারেই মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে সরাসরি আক্রমণ করেছেন তিনি। যার কারণে বিষয়টি নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন নেই, থাকার কথাও নয়। তার নিজের দল আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিসহ ছোট-বড়, ডান-বাম পন্থি প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী ইসলামী সংগঠন এই বক্তব্যের বিরোধিতায় স্বাভাবিকভাবেই এক কাতারে, কথা বলছে অভিন্ন সুরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বহুদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিক। আমার জানা মতে তিনি বেশ পড়াশোনা করেন, তার বইয়ের সংগ্রহও ভালো। তবে যেটা নিয়ে কথা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়েছে তখন তিনি ভারসাম্যহীন ছিলেন। তা না হলে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে তিনি বিষয়টির অবতারণা করতেন না। তিনি যেই সভায় ছিলেন, সেখানে এটি প্রাসঙ্গিকও ছিল না। কাজেই এই বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, ওই সময়ে তার তাত্ক্ষণিক মানসিক বিকৃতি ঘটেছে। ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয় প্রকাশ্যে স্বোচ্চারভাবে বলা মানসিক বিকৃতিরই লক্ষণ। তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানেও বলা আছে, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা যাবে না। এসব কারণে পুরো বিষয়টিই আমার কাছে বিপন্ন বিস্ময়। 
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে যখন বারবারই বলা হচ্ছে- ঈদের পর আন্দোলন করা হবে, অথচ আন্দোলনের জন্য তাদের সামনে দৃশ্যমান উল্লেখযোগ্য কোনো ইস্যু নেই সেখানে মন্ত্রী হয়ে লতিফ সিদ্দিকী নিজেই একটা ইস্যু সৃষ্টি করলেন। এনিয়ে সারাদেশে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে বিদ্যুত্ গতিতে যে ক্ষোভ দেশের সীমানাও পেরিয়েছে। তার এমন মন্তব্যে সরকার, আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষীরাও বিব্রত ও স্তম্ভিত। রাজনৈতিক ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রামে, সংকটময় মুহূর্তগুলোতে লতিফ সিদ্দিকীর ত্যাগ ও প্রজ্ঞার কথা কেউ অস্বীকার না করলেও মহানবী (সা.), হজ্ব ও তাবলিগ জামায়াতকে নিয়ে করা কটূক্তির কারণে তার সেসব রাজনৈতিক অবদানের কথাও এখন প্রকাশ্যে বলা যেন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কেন এই আত্মঘাতী ও দলঘাতী কাজ করলেন অভিজ্ঞ, রাজনৈতিক অনেক ঘটনা-অঘটনের জ্বলন্ত এই সাক্ষী?
রাজনৈতিক অভিজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে লতিফ সিদ্দিকী শুধু নিজের প্রতি নয়, নিজ পরিবার এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে পরিবারটির অবদানের প্রতিও অবিচার করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিকী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘এটা তো কোনো আলোচনার বিষয়ই নয়, ব্যাখ্যারও কিছু নেই (লতিফ সিদ্দিকী) কেন এসব বলেছেন সেটির জবাব কে দেবে?’
বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানীরা বলছেন, নিজ ধর্ম সম্পর্কে পৃথিবীর কোথাও কেউ এভাবে মন্তব্য করতে পারে এটা প্রায় কল্পনাতীত। অন্য ধর্ম সম্পর্কেও কেউ এই ধরনের মন্তব্য করতে পারেন না, কোনো ধর্মে তা অনুমোদিতও নয়। ‘আমি কিন্তু হজ্ব আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী, আমি জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী, তবে তার চেয়েও হজ্ব ও তাবলিগ জামাতের বেশি বিরোধী, এই হজ্বে যে কত ম্যানপাওয়ার নষ্ট হয়, হজ্বের জন্য ২০ লাখ লোক আজ সৌদিআরবে গেছে, এদের কোনো কাম নেই, এদের কোনো প্রডাকশন নাই, শুধু রিডাকশন দিচ্ছে, শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা দিয়ে আসছে, গড়ে যদি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক হজ্বে যায়, প্রত্যেকের পাঁচ লাখ টাকা করে পাঁচশ কোটি টাকা খরচ হয়’- এসব কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মন মানসিকতার কথা নয়।
তাদের মতে, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ্ব একটি, হজ্বের বিষয়ে পবিত্র কোরআনেই ব্যাখ্যা করা আছে। অর্থাত্ মুসলমানদের জন্য এটি কোরআনেই ফয়সালা করা আছে। সেইরকম একটি বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা এবং এর ‘আজব’ পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি মহানবী (সা.) ও তার সাহাবীদের সম্পর্কে যে কটূক্তি করেছেন তা অভাবনীয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, মহানবী ও হজ্ব সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার মাধ্যমে লতিফ সিদ্দিকী বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে গড়ে ওঠা ধর্মীয় সংস্কৃতিতেও আঘাত করেছেন। দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এখানে সব ধর্মের লোকই পরস্পরের ধর্ম বা ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ‘ধর্ম যার-যার, উত্সব সবার’- এরকম সংস্কৃতিতে পরিচিত এখানকার মানুষ। সেখানে নিজের ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি করে সেই সাম্য, সেই সংস্কৃতিতেও তিনি বিষ ঢেলেছেন।
শুধু ধর্মীয় বিষয়েই তালগোল পাকাননি লতিফ সিদ্দিকী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে করা তার মন্তব্যেও আহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষীরা যার প্রমাণ মেলে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, ‘সজীব ওয়াজেদ কে, এটা সবাই জানে। মুখফোঁড় কে কি বললো তাতে কিছু যায় আসে না।’ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন ‘জয় আমাদের ভবিষ্যত্ নেতা। এখন তার সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে তা হাস্যকর।’