ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৪, ১১:২৭
 উত্সব এলেই টাকার নতুন নোটের চাহিদা বাড়ে। আর এই চাহিদাকে পুঁজি করে চক্রগুলো জাল টাকার নোট বাজারে চালানোর চেষ্টা করে। এবারও ঈদ ও দুর্গাপূজায় জালনোট কারবারীরা বিশেষ কায়দায় একশ’ টাকার নোটকে পাঁচশ’ ও এক হাজার টাকার নোট বানিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশের বাজারে ছেড়েছে। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে দ্রুত চিনে নেয়া কঠিন। চক্রগুলো বিশেষ করে বাজার বা শপিংমল অথবা যেসব দোকানে সবসময় ভিড় থাকে সে সব স্থানকে টার্গেট করে মাঠে নামছে। এছাড়া কোরবানির পশুর হাটে টাকার বান্ডিলের মধ্যে সহজেই জালনোট চালিয়ে দিচ্ছে। চক্রগুলো বাজারে জালনোট ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি এটিএম বুথেও আসল টাকার সঙ্গে জাল টাকা মিশিয়ে দিচ্ছে বলে গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন। ঈদ ও পূজাকে কেন্দ  করে অন্তত ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকার জালনোট বাজারে ছাড়া হয়েছে বলেও তাদের আশঙ্কা।
এদিকে কেন্দ ীয় ব্যাংক চলতি বছর প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার জাল নোট শনাক্ত করেছে। এরমধ্যে গত জুন, জুলাই ও আগস্টে প্রায় ২২ লাখ টাকার জালনোট শনাক্ত করা হয়। এসব কারণে এবারের ঈদে জালনোট শনাক্তে কেন্দ ীয় ব্যাংক ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। জালনোট শনাক্তকরণের জন্য দেশের ৫৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেয়া হচ্ছে এক হাজারের বেশি যন্ত্র। 
জানা গেছে, এবার কোরবানির ঈদ পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেয়া হয়েছে জালনোট শনাক্তকারী ৪৯৫টি মেশিন। তারা এসব মেশিন নিয়ে কোরবানির পশুর হাটে বিশেষ টহল দিচ্ছে। এছাড়া কেন্দ ীয় ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে ঢাকার ২২টি পশুর হাটে অন্তত দুটি করে এবং ঢাকার বাইরে গুরুত্ব বিবেচনায় বড় পশুর হাটগুলোতে একটি করে ব্যাংকের বুথ বসানো হয়েছে। প্রতিটি বুথে দুটি করে জালনোট শনাক্তকারী মেশিন নিয়ে বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তিন মাসে ১০০০ টাকা মূল্যমানের ১৬২৩টি নোট (১৬২৩০০০ টাকা), ৫০০ টাকা মূল্যমানের ১১১২টি নোট (৫৫৬০০০ টাকা) ও ১০০ টাকা মূল্যমানের ৫৫টি নোট (৫৫০০ টাকা) জাল হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জাল শনাক্ত হয়েছে ২১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা। পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, শুধু আগস্টেই ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকা মূল্যমানের ১৫৪০টি জালনোট শনাক্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ ীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঈদকে সামনে রেখে জালনোট তৈরি ও সরবরাহ চক্রগুলো খুবই সক্রিয়। যার প্রমাণ ঈদ শুরুর আগের মাসে জালনোটের কেস অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। নিয়মিত মাসে যেখানে কেস থাকত ১০টি। এখন সেখানে কেস সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৩০টিতে। তিনি আরো বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো কেসের সঠিক বিচার কিংবা নিষ্পত্তি হয় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। প্রকৃত বিচার না হওয়ায় অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে জালনোটের পরিমাণও।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন:এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের সামপ্রতিক একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ঈদ-পূজায় জাল টাকার নোটের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন ও পুরনো মিলিয়ে রাজধানীতে বর্তমানে অন্তত ২৫টি জাল টাকা তৈরির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব সিন্ডিকেটের বেশিরভাগ সদস্যই এর আগে পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর জামিন পেয়ে ফের জালনোট তৈরি করছে। জামিনপ্রাপ্ত জালনোটের কারবারীদের বর্তমান অবস্থা তদন্ত করে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে সুপারিশ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী কেন্দি ক নোট জালিয়াতি চক্রের প্রত্যেকের কাছেই জালনোট তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে। এরা বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে জাল টাকা তৈরির মেশিন স্থাপন করে। জালনোট সাধারণত কয়েক ধাপে বাজারে ছাড়া হয়। প্রথম ধাপে পাইকারি হিসেবে এক লাখ জাল টাকার একটি বান্ডিল ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। দ্বিতীয় ধাপে পাইকারি কারবারীরা আবার এসব টাকা খুচরা কারবারীর কাছে ৩০-৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে। তৃতীয় ধাপে খুচরা কারবারীরা এসব টাকা নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে সরাসরি সুকৌশলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়।
সতর্ক পুলিশ:এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, জাল টাকা উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জাল টাকার মামলার জামিনপ্রাপ্ত এবং নতুন জাল টাকার কারবারীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটে কেউ যেন জাল টাকা ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করবে। পশুর হাট ও বড় শপিংমলগুলোতে থাকবে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন। তিনি আরো বলেন, জালনোট শনাক্ত মেশিন ব্যবহার ও একটু সচেতনতা অবলম্বন করলেই এ ধরনের প্রতারণার হাত থেকে বাঁচা যায়।
অপর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, জালনোটের কারবারীদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা পুলিশ কয়েকটি এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, রামপুরা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ ও মিরপুর। গত বছর যেসব এলাকা থেকে জাল টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল, সেসব এলাকায়ও সাঁড়াশি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ডিবি পুলিশের এডিসি সাইফুল ইসলাম বলেন, জামিনপ্রাপ্ত জাল টাকার কারবারীদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এদের কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলছে। জালিয়াত চক্রকে গ্রেফতারে পুলিশ সক্রিয় আছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেলের ডিসি মাসুদুর রহমান।
জাল টাকার সিন্ডিকেটে যারা: রাজধানীতে জাল টাকার ২৫টি সিন্ডিকেট রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তারা বেশিরভাগই একই গুরুর শিষ্য। জাল টাকার অন্যতম প্রবর্তক দুরুজ্জামান ওরফে নুরুজ্জামান বিশ্বাস জামিন পেয়ে বর্তমানে পলাতক। তার সহযোগী জালাল উদ্দিন, শান্তা, মোসাম্মত্ মাকসুদা, লিমা আক্তার, আবদুর রহমান, খালিদুজ্জামান, বাবু মিয়া, ডেসটিনি সুজন ও মঞ্জুরুল কামালের আলাদা সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা কোটি কোটি টাকার জালনোট এরই মধ্যে বাজারে ছেড়েছে। জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের জাল টাকার কারবারে যুক্ত হয়েছে হুমায়ুন কবির, পলাশ, সাইফুল ইসলাম, সুমন, আলাউদ্দীন ও শাহীন আক্তার। এদের মধ্যে আলাউদ্দিন ও শাহীন আক্তার স্বামী-স্ত্রী। তারা দুজন সহযোগীদের দিয়ে একটি গ্রুপ তৈরি করেছে। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া জাল টাকার কারবারিদের মধ্যে রয়েছে বিহারি বাবু, জসিম, হামিদ মাস্টার, সেলিম, রোজিনা, মরিয়ম, প্রেমা আক্তার, রাব্বি, রাজিব, জাহাঙ্গীর, জুবাই, লম্বা সাইফুল, ডালিম, শাহরুখ ওরফে রবি, মোল্লা সাইফুল, আনসারুল কবির, হারুনুর রশীদ, শাহানাজ বেগম, শিরিন আক্তার, জাকির, জহিরুল ইসলাম, সাবের আলী, দুলাল, বজলুর রহমান, সজিব, বিলাস আকন, রহিম বাদশা, নিয়াজ বাবু ও বাবু শেখ। তারা ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সহযোগীদের নিয়ে জালনোট তৈরির বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
নোট জাল হচ্ছে যেভাবে: জাল নোট তৈরি করতে সিকিউরিটি থ্রেড ও ওয়াশ পদ্ধতি ব্যবহার করছে জাল নোট তৈরির কারিগররা। কারিগররা টাকার সাইজে কাগজ কেটে তাতে আঠা ও সিকিউরিটি থ্রেড বসিয়ে তার ওপর প্রিন্টিং মেশিনের সহায়তায় সূক্ষ্মভাবে যে কোনো মূল্যমানের টাকার ছাপ বসিয়ে দেয়। অপর দিকে ওয়াশ পদ্ধতিতে জাল নোট তৈরি করতে আসল টাকার নোট ওয়াশ করে শুকানো হয়। পরে ওই নোটের ওপর টাকার অঙ্ক বসিয়ে ছাপ দেয়া হয়। এরা ১০০ টাকার নোট ওয়াশ করে সাদা করে তার ওপর ৫০০ ও ১০০০ টাকার অঙ্ক বসিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে সিকিউরিটি সুতা আসল থাকায় সহজেই কেউ ধরতে পারে না।
সবচেয়ে আঁঁতকে ওঠার বিষয় হচ্ছে, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরনো টাকার ওপর ছাপ বসানো হয়, যা জাল টাকা শনাক্তকারী মেশিন ধরতে পারে না। অনেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও জাল নোট নিয়ে গোলক ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছেন। আসল নোট চিনতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
আসল নোট চেনার উপায়: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংবলিত ১০০, ৫০০ ও এক হাজার টাকার নোটে মূল্যমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো সংবলিত নিরাপত্তা সুতা রয়েছে। নোটের মূল্যমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো নিরাপত্তা সুতার চারটি স্থানে মুদ্রিত আছে। নোট চিত্ করে ধরলে নিরাপত্তা সুতায় মূল্যমান এবং লোগো দেখা যাবে। কিন্তু কাত করে খাড়াভাবে ধরলে তা কালো দেখা যাবে। এ নিরাপত্তা সুতা অনেক মজবুত বা নোটের কাগজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নখের আঁঁচড়ে বা মুচড়িয়ে ওই নিরাপত্তা সুতা কোনোক্রমেই উঠানো সম্ভব নয়। জালনোটের নিরাপত্তা সুতা সহজেই নখের আঁঁচড়ে বা মোচড়ানোতে উঠে যায়।
এছাড়া প্রত্যেক প্রকার নোটের উপরের ডানদিকে কোনায় ইংরেজি সংখ্যায় লেখা নোটের মূল্যমান রং পরিবর্তনশীল কালিতে মুদ্রিত রয়েছে। ১০০ ও ১০০০ টাকা মূল্যমানের নোট আস্তে আস্তে নড়াচড়া করলে নোটের মূল্যমান লেখাটি সোনালি হতে ক্রমেই সবুজ রঙে পরিবর্তিত হয়। একইভাবে ৫০০ টাকা মূল্যমানের নোটে ৫০০ মূল্যমান লেখাটি লালচে হতে পরিবর্তিত হয়ে সবুজ হয়। জালনোটে ব্যবহূত এ রঙ চকচক করলেও তা পরিবর্তিত হয় না। এ ছাড়া প্রত্যেক প্রকার নোটের সম্মুখ ও পশ্চাত্ পৃষ্ঠের ডিজাইন, মধ্যভাগের লেখা, নোটের মূল্যমান এবং সাতটি সমান্তরাল সরলরেখা উঁচু-নিচু (খসখসে)ভাবে মুদ্রিত আছে। তাছাড়া নোটের ডানদিকে ১০০ টাকার নোটে তিনটি, ৫০০ টাকার নোটে চারটি এবং ১০০০ টাকার নোটে পাঁচটি ছোট বৃত্তাকার ছাপ আছে, যা হাতের স্পর্শে উঁচু-নিচু (খসখসে) অনুভূত হয়।