ঠাঁই নেই বাস ট্রেন লঞ্চে

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৪, ১১:২৯
ঈদ-পূজার ছুটিতে নির্মল বাতাসের খোঁজে শেষ মুহূর্তে ঘরে ফিরেছেন লাখ লাখ মানুষ। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাটে ছিল জনস্রোত। শুক্রবার সকল দুর্ভোগ-বিপত্তি পেছনে ফেলে প্রশান্তির আশায় জীবনের ঝুঁকিকে আলিঙ্গন করেছেন ঘরমুখোরা। যাত্রীদের মাত্রারিক্ত চাপে বাস, ট্রেন কিংবা নৌপথের লঞ্চ-স্টিমারে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। বাস, ট্রেন ও লঞ্চের কামরায় জায়গা না পেয়ে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে ছাদে। তবে সঠিক সময়ে বাস-ট্রেন-লঞ্চ না আসা এবং চিরচেনা যানজটে দীর্ঘ সময়ে অপেক্ষার মধ্যে যাত্রীদের চোখে-মুখে ছিল ঈদের আনন্দ। মহাসড়কগুলোয় তীব্র যানজট বাসযাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) সামপ্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বর্তমানে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ বাস করছে। রেলওয়ে ও পরিবহন সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হিসাব মিলিয়ে দেখা গেছে, এবারের ঈদে সড়ক, রেল ও নৌপথে রাজধানী ছাড়বেন প্রায় এক কোটি মানুষ। এর বেশির ভাগই সড়ক পথে বাড়ি ফেরেন। এরপর ট্রেন, লঞ্চ ও আকাশ পথে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল শুক্রবার ভোর থেকেই হয়ে ওঠে লোকে-লোকারণ্য-উত্সবমুখর। ঢাকা থেকে বের হবার প্রতিটি পথেই গতকাল ভোরে এবং সন্ধ্যার পর রীতিমতো জনসে াত নামে। ভোরে নগরীর বাস টার্মিনালের বহির্মুখী প্রতিটি সড়কে ছিল তীব্র যানজট। তবে সন্ধ্যার দিকে আবারও সদরঘাট এবং সায়েদাবাদ ও গাবতলীর রাস্তায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। বাস-ট্রেন ও লঞ্চের যাত্রা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশনে পৌঁছলেও নানা দুর্ভোগ পিছু ছাড়েনি কারোই। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে মহাসড়কের যানজট।
পাল্টে যাচ্ছে চিরচেনা ঢাকা ঃ ঈদের আর মাত্র একদিন বাকি। এর মধ্যে অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে ঢাকা শহর। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়ছে।  তবে শুক্রবার ছুটির দিনে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। ঘরমুখো মানুষের কারণে ঢাকা শহরের চিরচেনা রুপ পাল্টে গেছে। মানুষের চলাচল কম। তাই প্রাণচাঞ্চল্য নেই রাজধানীর রাস্তাগুলোতে। যা অব্যাহত থাকবে প্রায় সপ্তাহখানেক। মার্কেটগুলোতে চলেছে শেষ সময়ের কোনাকাটা। মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউ মার্কেট, যাত্রাবাড়ি কিংবা মহাখালী কোনখানেই যানজট ছিল না। সকাল থেকেই রাজপথে গাড়ি চলাচল করেছে খুবই কম।
ট্রেন ছেড়েছে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা বিলম্বে :গতকাল কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে দেখা যায় ঘরমুখো মানুষের ভিড়। আর এ ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে ট্রেনে উঠছেন। গন্তব্য ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন ও দরজা-জানালায় ঝুলে যেতে দেখা গেছে। বগির মাঝখানে, অর্থাত্ দুই বগির জয়েন্টে বসে যেতেও দেখা গেছে যাত্রীদের। এরপর আবার ট্রেন-বাসের শিডিউল বিপর্যয়।
তূর্ণা এক্সপ্রেস কমলাপুর ছেড়ে যাওয়ার কথা সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে। এজন্য কোলের দুটি শিশু সন্তান নিয়ে সপরিবারে ফজরের নামাজ পড়ে কমলাপুরে রওনা দিয়েছিলেন মাকসুদ আলম। সকাল সাড়ে ৬টায় পৌছান স্টেশনে। এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে কোলের সন্তান নাঈম। সকাল ৯টা বেজে গেলেও দেখা মেলেনি ট্রেনের। ট্রেনটি ৪ ঘণ্টা বিলম্বে সকাল সাড়ে ১০টায় আসে। এরপর ৪ ঘণ্টা বিলম্বে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। দিনভর কমলাপুরে চলাচলকারী ২৮টি ট্রেনের প্রায় সবকটি ট্রেনই চলেছে বিলম্বে।
দিনাজপুরগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ১ ঘণ্টা বিলম্বে স্টেশন ত্যাগ করেছে। মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটির অবস্থাও একই। চট্রলা এক্সপ্রেস ট্রেনটি চলেছে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বে। রাজশাহী এক্সপ্রেস ১১টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বিকাল ৩টা পর্যন্ত ট্রেনটির দেখা মেলেনি। হাজার হাজার যাত্রী স্টেশনে অপেক্ষা করছে। প্রায় সব ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হওয়ায় কমলাপুর স্টেশন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। অসহায় যাত্রীরা প্রত্যাশিত ট্রেনের খবর নিতে অনুসন্ধানে যোগাযোগ করলেও দুব্যবহারের শিকার হচ্ছেন।
বাস কাউন্টারে অপেক্ষার শেষ নেই :রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে বাসের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে টিকিট কেটেও নির্ধারিত সময়ে বাস পাননি যাত্রীরা। ফেরিঘাটে পশুবাহী ট্রাকগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল সকাল থেকে গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনালে বিভিন্ন ব?াস কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখ?া গেছে।
ঝিনাইদহের যাত্রী কবির হোসেন জানান, দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে যাত্রার জন্য ১২টা থেকে মাজার রোডের জেআর ট্রাভেলস পরিবহন কাউন্টারে আসেন তিনি। কিন্তু কাউন্টারে গিয়ে বাসের সিডিউল জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ বলে, গাড়ি কখন ঢাকায় এসে পৌঁছবে তা এখনো তারা জানেন না। সন্ধ্যা ৬টায় গাড়ি ঢাকায় পৌঁছলে ৬ ঘন্টা বিলম্বে গাড়ি যাত্রা শুরু করে।
নির্ধারিত বাস না পেয়ে অনেকে টিকিট বাতিল করছেন। অনেকেই লোকাল বাসে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্য ঢাকা ছাড়ছেন। কেউবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উঠছেন বাসের ছাদে। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা, যানজট ও ফেরি পারাপারের দীর্ঘ বিলম্বের কারণে কোনো পরিবহনের বাসই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। দূরপাল্লার পরিবহন কোম্পানিগুলো ঈদের বিশেষ ট্রিপ শুরু করলেও চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বেলা ১১টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল পারিদর্শনে গিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তির কথা শোনেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
মহাসড়কে মহাজট :মহাসড়কগুলোয় মহাজটের কারণে ঘরে ফিরতে ঘন্টার পর ঘন্টা লেগে যাচ্ছে। প্রতিটি মহাসড়কে গাড়ি চলছে ধীর গতিতে। গতকাল পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে তিন কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়েছে। মাওয়া-কাওড়াকান্দি ঘাট এলাকায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপের কারণে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মাদারীপুরের শিবচরের পাঁচ্চর থেকে যানজট সৃষ্টি হয়। মাওয়া-কাওড়াকান্দিতে ২১ জেলার ঘরমুখী মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। মাওয়া চৌরাস্তা থেকে শ্রীনগর বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাস-ট্রাকের জট দেখা গেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে ৩৫ কিলোমিটার জুড়ে যানজট হয়।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও এর আশেপাশে এলাকায় ২০ কিলোমিটার ও কালিয়াকৈর নবীনগর মহাসড়কের চন্দ্রা থেকে বাড়ইপাড়া পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার মহাসড়কে যানজট বিড়ম্বনায় ফেলেছে উত্তরবঙ্গগামী ঘরমুখো যাত্রীদের। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও একই অবস্থা। সড়ক পথে গরুর হাট ছাড়াও এসব সড়ক ও নৌপথে কোরবানির পশু ট্রাকে আসছে রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে এসব ট্রাক আগে ছাড়ার কারণে মূলত যানজট সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ করেছেন পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী :গতকাল সদরঘাট থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায় দেড় শতাধিক লঞ্চ। এর প্রায় সবকটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি যাত্রী নেয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী নিতে দেখা গেলেও পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। লঞ্চের ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যের অভিযোগ রয়েছে যাত্রীদের। বিভিন্ন রুটের লঞ্চের কেবিনের টিকিট কালোবাজারে বিক্রি হয়। ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে দুই হাজার টাকার কেবিন নেয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ঈদ ও পূজায় যাত্রীদের বাড়ি পৌঁছা নির্বিঘ্ন করতে নৌ মন্ত্রণালয়ের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে দাবি করেন। গতকাল মাদারীপুরে তিনি বলেন, এবার প্রত্যেক নৌ ঘাট এলাকায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। যাতে লঞ্চ অতিরিক্ত কোনো যাত্রী নিতে না পারে। 
আকাশ পথে অর্ধলক্ষ মানুষ : ট্রাভেল এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, আকাশপথেও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, খুলনা, বরিশাল, সৈয়দপুর, সিলেট, কক্সবাজারসহ যেসব জেলায় বিমানবন্দর রয়েছে, সেসব জেলার প্রায় অর্ধ লাখ লোক ঢাকা ছাড়বেন। সড়ক ও রেলপথে ভোগান্তির কারণে এবার কেউ কেউ টাকা বেশি হলেও আকাশপথকেই নিরাপদ মনে করছেন।
দুই লঞ্চ মালিককে লাখ টাকা জরিমানা :অতিরিক্ত যাত্রী বহনের দায়ে সদরঘাটে দুটি লঞ্চের মালিককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল বিকাল পৌনে ৫টার দিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে অভিযান চলাকালে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। লঞ্চ দু’টি হলো- গোলাম কিবরিয়া টিপুর মালিকানাধীন এমভি পানামা এবং জয়নাল আবেদিনের মালিকানাধীন কর্ণফুলী-৯। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মমতাজ বেগম তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেন।