চাপমুক্ত সরকার, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন নয়

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৪, ১৩:৩৭

সংবিধান নির্ধারিত সময়ের আগে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেশের ভেতর-বাইরে কোনো ধরনের চাপে নেই সরকার। যার কারণে অনিবার্য কোনো কারণ ছাড়া ২০১৯ সালের আগে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা সরকারের ভাবনায়ও নেই। তাই নির্বাচন নিয়ে কারও সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনার প্রয়োজন আছে বলেও সরকার মনে করছে না। আর তাই বিএনপি যখন সংলাপের কথা বলছে, তখন তার ও তাদের সহযোগীদের সঙ্গে বসার কোনো ইচ্ছাও সরকারের নেই। তাদের আন্দোলনের হুমকিতেও সরকার চিন্তিত নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরে শুক্রবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই সংক্রান্ত প্রশ্নসমূহের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটির বিশ্লেষণে এই বার্তাই পরিষ্কার বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রায় ৯ মাস পর এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিলেন-মধ্যবর্তী নির্বাচনও নয়, এনিয়ে কোনো সংলাপও করবে না তার সরকার। বর্তমান সরকারের মেয়াদে চীন, জাপান ও যুক্তরাজ্য সফরের পরেও পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ও সংলাপ বিষয়ে এরকম পরিষ্কার কথা বলেননি প্রধানমন্ত্রী। জাপান সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও তিনি বলেছিলেন, ‘আগাম নির্বাচনের দরকার পড়লো কেন? তারপরেও সবাই চাইলে হতে পারে!’

 

তবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কুশল বিনিময়, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠক এবং ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদীর সঙ্গে প্রথমবারের মতো দ্বি-পক্ষীয় বৈঠকের পরেই শেখ হাসিনা বললেন ‘নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো নির্বাচন নয়, এনিয়ে কারও সঙ্গে সরকারের সংলাপেরও কোনো দরকার নেই।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী উত্সগুলোর সঙ্গে কথাবার্তার পর প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে এটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আগাম নির্বাচন প্রশ্নে আন্তর্জাতিকভাবে এক ধরনের চাপ রয়েছে বা থাকবে বলে কোনো কোনো মহলের যে ধারণা ছিল, সেই অংকে সম্ভবত গরমিল রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য গত ২৬ সেপ্টেম্বর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘রাজনীতিতে কেউ ভুল করলে সেটির খেসারত তাদেরই দিতে হবে। সংসদে এখন বিরোধী দল আছে। যারা বাইরে আছে তারা তো বাইরেই থাকবে।’ এই সংবাদ সম্মেলনে সংলাপের সম্ভাবনাও নাকচ করে তিনি বলেছেন ‘সংলাপ? সংলাপ আবার কী? কার সঙ্গে সংলাপ? দেশে এমন কী পরিস্থিতি হয়েছে যে, সংলাপে বসার প্রয়োজন পড়লো! যারা নির্বাচন বর্জন করেছে তারা ভুল করেছে। এখন সংলাপ করে কী তাদের ক্ষমতায় আনতে হবে?’

 

এই বক্তব্যের ধারাবাহিকতা দেখা যায় শুক্রবার গণভবনের সংবাদ সম্মেলনেও। এখানেও এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন ‘জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন অতীতে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। এবার আলোচনায় তিনি কি এ বিষয়ে কিছু বলেননি?’ জবাবে শেখ হাসিনা হাসিমুখে বলেন, ‘এবার কিন্তু বলেন-টলেন নাই। বোধ হয় আর কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন না।’ অন্যদিকে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই সমালোচনামুখর। এই নির্বাচনকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন’ বলে আসছে মার্কিন প্রশাসন। তবে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মধ্যবর্তী নির্বাচন ও সংলাপ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা বলেছেন ‘এটা বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই এর সুরাহা করবে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক কারণে প্রতিবেশি ভারতসহ পশ্চিমা দুনিয়াও এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নাতীত না হওয়ায় নিজেদের অবস্থান থেকে সঙ্গত কারণেই তারা বাংলাদেশেও কার্যকর গণতন্ত্র দেখতে চায়। তবে সন্ত্রাসবাদ দমন প্রশ্নে যেমন তাদের অবস্থান অভিন্ন, তেমনি বিশ্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তাদের কাছে ত্রুটিমুক্ত গণতন্ত্রের চেয়েও বেশি প্রাধান্য পায়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের নির্বাচন ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার প্রসঙ্গকে তারা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবেই দেখছে। এই অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের কোনো অস্থিতিশীলতা বা হুমকির প্রশ্ন ছাড়া এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উপযাজক হয়ে চাপ সৃষ্টির কোনো কারণ নেই। যার ফলে সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও আগাম নির্বাচন প্রশ্নে বিদেশিদের দিকে বিএনপির তাকিয়ে থাকা কোনো ফল দেবে, সেই সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে।

রাজনৈতিক হিসাব-নিকাষে অভিজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকার ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করবে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান এতদিন ধূসর থাকলেও এখন স্পষ্ট। আর বিএনপি যে নির্দলীয় সরকারের কথা বলছে, বর্তমান সংবিধানেও সেটির কোনো সুযোগ নেই। বিএনপির দাবি মানতে হলে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। যেহেতু নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা আর না ফেরানোর প্রশ্নে সরকার অনড়, সে কারণে এই ইস্যুতে সংবিধান সংশোধনেরও সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে, সরকারের নির্ধারিত মেয়াদ শেষেই, অর্থাত্ ২০১৯ সালেই পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হবে। আর সেটিও হবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অধীনেই। সাংবিধানিক এই ধারাবাহিকতার ফলে নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি বা কারও সঙ্গে কোনো আলোচনার দরকার আছে বলে মনে করছে না সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ব্যাখ্যা করলে আরও যে বিষয়টি ধরা পড়ে তা হচ্ছে, যেহেতু আগাম নির্বাচনের কোনো চিন্তা নেই, তাহলে এখন সংলাপ বা আলোচনা হবে কী নিয়ে। তাছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক না কেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের মেয়াদ এখনও ৪ বছরের বেশি। সুতরাং এত আগে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করে কোনো সমঝোতা হবে বলেও সরকার মনে করছে না। বরং সরকারের শারীরিক ভাষা জানান দিচ্ছে, ‘২০১৯ সাল আসুক, তারপর নির্বাচন নিয়ে আলোচনা দেখা যাবে।’

প্রধানমন্ত্রী মধ্যবর্তী নির্বাচন ও সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জামালপুরে ২০ দলের জনসভায় বলেছেন ‘বিএনপির সঙ্গেই আলোচনায় বসতে হবে, যদু-মধু-রাম-সামের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ হবে না।’ তবে শুক্রবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা সেই বার্তাও দিলেন যে, বিএনপির সঙ্গে তার সরকারের কোনো আলোচনারও আগ্রহ নেই। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘যারা খুনি, যারা ক্যু করে ক্ষমতা দখল করে, যারা খুনের মাধ্যমে বিদায় নেয়, যারা দুর্নীতি করে, তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে? এত রাজনৈতিক দৈনতায় আমরা ও বাংলাদেশের মানুষ পড়েনি।’

 

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা হবে। সরকার যে বিএনপির আন্দোলন হুমকি নিয়েও চিন্তিত নয়, সেটিও পরিষ্কার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেছেন ‘কঠোর আন্দোলন কত কঠোর হতে পারে, সেই কঠোরতা দেখার ক্ষমতা সরকারের আছে। তিনি (খালেদা জিয়া) আরও কঠোর আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামুক না, আসুক, তারপর দেখা যাবে।’