ব্র্যাক ব্যাংকের জয়পুরহাট শাখা থেকে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকা লুটের ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী শামীম ও ব্যাংকের ভল্ট আনলক স্পেশালিস্ট রাজা মিয়াসহ ৭ জনকে আটক করেছে র্যাব। তাদের কাছ থেকে ৫৬ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে র্যাব হেডকোয়ার্টারে সাংবাদিক সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। বুধবার রাতে ঢাকা, আরিচা ও মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকা থেকে এই ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা নিজেরাও টাকা চুরির কথা স্বীকার করেছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে জয়পুরহাট শহরের প্রধান সড়কের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা থেকে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকা চুরি হয়। সকালে অফিস খুলে দেয়াল ভাঙা দেখে ব্যাংকের কর্মচারীরা পুলিশে খবর দেন। চুরির আগে ভবনের বিদ্যুত্ সংযোগ ও ভল্টরুমের সিসি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরার সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। পাশের মার্কেটের দেয়াল কেটে চোরেরা ভেতরে প্রবেশ করে।
সাংবাদিক সম্মেলনে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ঘটনার পর র্যাব গোয়েন্দা দল অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হয়, এই ঘটনার মূল হোতা রাজা মিয়া মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে অবস্থান করছে। র্যাব-১১ এর একটি দল বুধবার রাতে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের হাশারপাড়া এলাকা থেকে রাজা মিয়াকে (৪৫) গ্রেফতার করে। পরে তার দেয়া তথ্য মতে ওই রাতেই বাদল মল্লিক বাবলা (৪৯), মো. মঞ্জুরুল হাছান শামীম (৩২), অনুপ চন্দ্র পন্ডিত (২১) ও তার ভাই প্লাবন চন্দ্র পন্ডিতকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দেয়া তথ্যে ভোর রাতে স্বপন দেবনাথ (৪০) ও এম কে কুদ্দুসুর রহমান বুলুকে (৫২) নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা ষ্টেডিয়ামের সামনে থেকে গ্রেফতার করে।
মুফতি মাহমুদ খান বলেন, জয়পুরহাট ব্যাংক ডাকাতির অন্যতম মূল নায়ক রাজা মিয়া ২০০২ সালে ঢাকার ধানমন্ডিস্থ ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ২৫০ ভরি স্বর্ণালংকার লুটের সাথে জড়িত। স্বর্ণ লুটের দুই দিন পর ওই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট রাজা মিয়াসহ ১৮/১৯ জন গ্রেফতার হয় এবং দেড় বছর কারাভোগ করে। কারাগারে থাকাকালীন সময় শামীমের সাথে রাজা মিয়ার পরিচয় হয়। জেল থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর শামীমের সাথে রাজা মিয়ার আকস্মিক দেখা হয় এবং শামীম তার মোবাইল নম্বর রাজা মিয়াকে দিয়ে যোগাযোগ করার জন্য বলে।
রাজা মিয়া র্যাবকে বলেছে, গত রোজার ঈদের ২০ থেকে ২৫ দিন আগে রাজা মিয়ার সাথে শামীমের ফোনে যোগাযোগ হয় এবং শান্তাহারে গিয়ে ব্যাংক ডাকাতির সাথে সংশ্লিষ্ট তাজ, নওশের, ইসলাম, ইকবাল, বুলু ও স্বপন সাথে জয়পুরহাটের এক বাসায় তার পরিচয় হয়। ডাকাতির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১২ সেপ্টেম্বর ব্র্যাক ব্যাংক সংলগ্ন একটি ঘর Bangladesh poor development Ltd. নামক একটি এনজিও এর অফিস দেখিয়ে ভাড়া নেয়। পরিকল্পনা মোতাবেক শামীম মালিকের সাথে ঘর ভাড়া করার ব্যাপারে চুক্তি করে এবং বুলুকে ভাড়ার ৫/৬ হাজার টাকা দিয়ে ঘর মালিকের কাছে দিতে বলে। বুলু টাকা দিয়ে দোকানের চাবি ইসলামকে বুঝিয়ে দেয়। ডাকাতির ১০ দিন আগে রাজা মিয়া তার পরিচিত স্বপনকে দেয়াল কাটার জন্য আসতে বলে।
রাজা মিয়া আরো জানিয়েছে, ডাকাতির প্রায় ১ সপ্তাহ আগে থেকে ইসলাম ও তাজ দেয়াল কাটার কাজ শুরু করে এবং এই কাজ সম্পন্ন করতে তাদের প্রায় ৬ দিন সময় লাগে। দেয়াল কাটার পর ব্র্যাক ব্যাংকে প্রবেশ করার মতো সুড়ঙ্গ তৈরী করে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে তাজ মাহমুদ ও নওশের ব্যাংকে প্রবেশ করে সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং তার কিছুক্ষণ পরই রাজা মিয়া ও ইসলাম আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি নিয়ে ভোল্টে প্রবেশ করে এবং ভোল্টের তালা ভেঙ্গে ফেলে। ভল্টের তালা ভাঙ্গার পর ভিতরে সাজানো ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তারা কয়েকটি ব্যাগে ভর্তি করে এবং ভাড়াকৃত ব্যাংক সংলগ্ন রুমে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে লুট করা টাকা পার্শ্ববর্তী ঘরে ভাগাভাগি করে নেয় এবং বিভিন্নজন বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে, লুট করা টাকা থেকে রাজা ৩১ লাখ, শামীম ৩৩ লাখ, ইসলাম ১২ লাখ ৫০ হাজার, তাজ মাহমুদ ৮ লাখ, এমকে কুদ্দুসুর রহমান বুলু ও ইকবাল ৩৩ লাখ, স্বপন ১৮ লাখ, নওশের ১৪ লাখ ও বাদল ৯ লাখ টাকা ভাগ পেয়েছে।
