প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘হুদহুদ’ আজ রবিবার ভারতের উত্তর অন্ধ্র ও দক্ষিণ উড়িষ্যা উপকূলে আঘাত হানতে পারে। উপকূলে আছড়ে পড়ার আগে শক্তি বাড়িয়েই চলেছে ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ। গতকাল শনিবার সকালে অন্ধ্র উপকূল থেকে প্রায় তিনশ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল ঘূর্ণিঝড়। আজ রবিবার দুপুরের মধ্যেই ওই রাজ্য দুইটির উপর আছড়ে পড়বে বলে জানিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর। ঘণ্টায় ১৫৫-১৮০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আগাম ব্যবস্থা হিসাবে দুই রাজ্য থেকে এখনো পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষকে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ মেঘলা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, অতি প্রবল এ ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার সৃষ্টি হচ্ছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্র বন্দরসমূহের উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে তিন নম্বর স্থানীয় সর্তকতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় জেলাগুলো ১ থেকে ৩ ফুট উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিঃ মিঃ এর মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিঃ মিঃ, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৭০ কিঃ মিঃ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে। সাগরে অবস্থানরত মাছ ধারার নৌকা ও ট্রলারসূমহকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে আবহাওয়া অফিস।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাওয়া-কাউরাকান্দি এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে সকালে দুই দফা লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। দুপুরের পরে আবার লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ। বরগুনার পায়রা নদীতে অস্বাভাবিকভাবে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শুক্রবার রাতে আমতলী উপজেলার বৈঠাকাটা নামক স্থানে বেড়ীবাঁধ ভেঙে ৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ওইসব এলাকার আমন ফসলসহ ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট পানির নীচে তলিয়ে গেছে। গতকাল শনিবার পানি আরো বেড়ে যাওয়ায় আমতলী ও তালতলী উপজেলার বেড়ীবাঁধের বাইরে অবস্থিত আরো ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলে গতকাল বিকালে বামনী নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী ৩টি ইউনিয়নের ২১ হাজার মানুষ পানিবন্ীদ হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় “হুদহুদ” সামান্য পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে বর্তমানে একই এলাকায় অবস্থান করছে।
ঘূর্ণিঝড়টি গতকাল বিকাল ৩টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ২০ কিঃ মিঃ পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৭০ কিঃ মিঃ পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৭৫ কিঃ মিঃ দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৮৮০ কিঃ মিঃ দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও পশ্চিম ও উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আজ সকাল থেকে দুপুর নাগাদ ভারতের উত্তর অন্ধ্র ও দক্ষিণ উড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১-৩ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে ।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ভারতের উত্তর অন্ধ্র ও দক্ষিণ উড়িষ্যার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানরত সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ‘হুদহুদ’-এর প্রভাবে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে চট্টগ্রামের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বিকালের দিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাত শুরু হয়। গভীর সমুদ্র এলাকায় মাছধরার নৌযান ও ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় সেগুলো দলে দলে ফিরছে বিভিন্ন ঘাটে। তবে বাংলাদেশ সীমানায় বঙ্গোপসাগর এখনো শান্ত রয়েছে বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের কন্ট্রোল রুম জানায়, এখানে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেয়া হয়েছে। তবে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পাওয়া এবং সাগর স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা উত্তাল রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বহির্নোঙরে সতর্কতা নেয়া হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানান, ঘূর্ণিঝড় গতকাল বিকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে ১০২০ কিলোমিটার পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিলো। আজ রবিবার যে কোন সময় সেটি ভারতের উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে প্রথমে দুপুর পৌনে ১টা থেকে পৌনে ২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখে বিআইডব্লিউটিএ। প্রথম দফা চালুর ১৫ মিনিট পর ঝড় শুরু হয়। পরে আবার ২টায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পরে ঝড় থেমে গেলে দুপুর আড়াইটায় দ্বিতীয় দফায় লঞ্চ চলাচল শুরু হয়। এসময় ফেরিগুলোতে যানবাহনের চেয়ে লোকসংখ্যাই বেশি হয়ে যায়। এতে যান পারাপার বিঘ্নিত হয়। যাত্রীরা পড়েন বিপাকে।
এ সময় স্পীডবোটও চলছে সীমিত আকারে। একে তো ঈদের ছুটি শেষে ঢাকামুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়, তারপর মাওয়া এবং কাওড়াকান্দি উভয়প্রান্তে পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি না থাকায় ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে চরম দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। এভাবেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। উত্তাল নদী এবং ঝড়ে অনেকেই এই রুটের ছোট লঞ্চ ও স্পীডবোটে উঠতে ভয় পাচ্ছিল। তারা অপেক্ষা করছিলেন ফেরির জন্য। বিআইডব্লিইটিএ’র মাওয়া বন্দর কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন জানান, ২নং সতর্ক সংকেত থাকলেও পদ্মা খুবই উত্তাল। তাই দু’ দফা লঞ্চ বন্ধ রাখা হয়। তবে আবহাওয়া একটু ভালো হওয়ায় লঞ্চ চলাচলে আবার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
শনিবার মাওয়া ঘুরে দেখা যায়, সকাল হতে পদ্মার ওপার হতে লঞ্চ, স্পিডবোট ও ট্রলারে করে হাজার হাজার যাত্রী মাওয়ায় এসে ঢাকার বাসের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। প্রতিটি লঞ্চ, স্পিডবোট ও ট্রলারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহনের অভিযোগ রয়েছে। তবে কাওড়াকান্দি প্রান্তে আজ শনিবার মনিটরিং টিম এবং ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক অবস্থান করায় লঞ্চগুলো অতিরিক্ত যাত্রী বহন করেছে অপেক্ষাকৃত কম। মাওয়া বাস কাউন্টারে যাত্রীরা ঢাকার বাসের জন্য ভিড় জমাতে থাকে।
কর্মস্থলমুখী মানুষের ঢল থাকায় সুবিধাবাদীরা স্পিডবোট, লঞ্চ এবং বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। যাত্রীর উপচেপড়া ভিড়ের সুযোগ নিয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের লোকাল বাসগুলো ভাড়া বেশি আদায় করছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। মাওয়ায় সচরাচর লোকাল বাসের ভাড়া ৬০ টাকা এবং গেইট লক বাসের ভাড়া ৭০ টাকা হলেও এখন যাত্রীদের নিকট থেকে ৯০ থেকে ১শ’ টাকা নেয়া ভাড়া নেয়া হচ্ছে। ইলিশ পরিবহন, বিআরটিসি, গুনগুন, গ্রেট বিক্রমপুর, প্রচেষ্টা, গাংচিলসহ এই রুটের সকল বাসেরই একই অবস্থা। একই অবস্থা স্পিডবোট ও লঞ্চে। এই রুটে স্পিডবোটের ভাড়া ১২০ টাকা হলেও ২শ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা ভাড়া নেয়া হয়েছে। লঞ্চ ভাড়া ৩৩ টাকার স্থলে ৪৫/৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
মাওয়া বিআইডব্লিউটিএ’র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর রিয়াদ হোসেন স্পিডবোটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কথা স্বীকার করে বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে স্পিডবোটে সরকারি রেট ১২০ টাকার স্থলে ২শ’ টাকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে। আর লঞ্চে সরকারি ধার্যকৃত ভাড়া ৩৩ টাকার স্থলে ৪৫ টাকা নেয়া হচ্ছে বলে শুনেছি। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মাওয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্য এসআই খন্দকার খালিদ হাসান জানান, মাওয়ায় প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এতে জনগণ কিছুটা সমস্যায় পড়ছে। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জনগণের নিরাপত্তায় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানায়, বৈরি আবহাওয়ার প্রভাবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজীরহাট নৌ-রুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হয়। বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা সকাল ১০টা থেকে প্রায় দেড়ঘণ্টা লঞ্চ বন্ধ রাখেন। গতকাল সকাল ৮টা থেকে মুসলধারে বৃষ্টির কারণে ঈদ ফেরত কর্মমুখী হাজার হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগ পোহায়। এছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পাটুরিয়া ও আরিচা থেকে এক শ্রেণির পরিবহন মালিক-শ্রমিক ২/৩ গুণ বেশি ভাড়ায় যাত্রী তোলেন। বাসের ছাদে ও খোলা ট্রাকে যাত্রীরা বৃষ্টিতে ভিজে দুর্ভোগের শিকার হয়। উভয় ঘাটে যাত্রী এসব চাপ সামাল দিতে বিআরটিসির দোতালা বাস চলাচল করতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নৌ-দুর্ঘটনা রোধে লঞ্চ ও ফেরি চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। এছাড়া যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গা জেলার সর্বত্র গতকাল দিনভর থেমে থেমে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সারাদিন আকাশ হালকা মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। সকালের দিকে সূর্যের ঝলমলে আলো দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা মেঘে ঢাকা পড়ে যায়। জেলার সর্বত্র একই আবহাওয়া বিরাজিত ছিল।
