লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদও যাবে!

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৪, ১০:৫০
মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কারের পর জাতীয় সংসদের সদস্য পদও হারাতে পারেন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের চেতনা (স্পিরিট) ব্যাখা করে ইতিপূর্বে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারেন।
এদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব গতকাল শনিবার সকালে জানান, মন্ত্রিসভা থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে বরখাস্ত করার সকল দাপ্তরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। যে কোন সময় প্রজ্ঞাপন জারি হবে। তবে কবে, কোন প্রক্রিয়ায় লতিফ সিদ্দিকীকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট করেননি মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করুন।  আর আওয়ামী লীগের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবুল আলম হানিফ গতকাল জানান, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় আজ রবিবার অনুষ্ঠেয় দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ইতিমধ্যে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন সম্পর্কিত যেসব খবর প্রচার হয়েছে সিদ্ধান্ত সেভাবেই হবে। জানা গেছে, লতিফকে দলের সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।
লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী পর্ষদ প্রেসিডিয়ামের সদস্য। তিনি ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে তিনি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী পদে বহাল আছেন।
এমপি পদ থাকবে কি থাকবে না
লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কিনা এ নিয়ে নানা মহলে জোরালো আলোচনা-গুঞ্জন চলছে। অনেকেই বলছেন ইতিপূর্বে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের চেতনা (স্পিরিট) ব্যাখা করে উচ্চ আদালতের দেয়া রায় এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে ডা. আলাউদ্দিন আহমেদ ও হাসিবুর রহমান স্বপন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে তত্কালীন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদে এই দুই জনের সদস্য পদ থাকার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। এতে হাইকোর্ট ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখা দিয়ে উল্লেখ করেছিল যে, এক দলের আদর্শ ও বিশ্বাস নিয়ে নির্বাচিত হয়ে অন্য দলের আদর্শ ও বিশ্বাস ধারন করা নৈতিকতা বিরোধী। এটি দলের বিপক্ষেই অবস্থান। একে নীতি বিসর্জনের ঘটনা বলেও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বিএনপির গঠনতন্ত্রেও উল্লেখ আছে যে, তাদের দল থেকে নির্বাচিত কেউ অন্যদলে যোগ দিলে তিনি সংসদীয় দলের সদস্য থাকবেন না। হাইকোর্ট বিভাগ তখন ওই দুজনের সংসদ সদস্যপদ বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। এর বিপক্ষে সরকার পক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে।
এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন যে, লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে একই কারণে আপিল বিভাগের রায় কার্যকর হতে পারে।
অবশ্য বিগত নবম সংসদে জাতীয় পার্টির (জাপা) সদস্য গোলাম রেজা হাবিবকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে সে সময়ে জাপার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সংসদকে তথা স্পিকারকে কিছু অবহিত করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’
‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হইবে কিনা, সে সম্পর্কে কোন বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে’।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি মন্ত্রিপরিষদ সচিব
এদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেছেন, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ সংক্রান্ত আদেশে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পরপরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
লতিফ সিদ্দিকী নিজ থেকে পদত্যাগ করেছেন, নাকি তাকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রজ্ঞাপন জারির সময়ই বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত সেটা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। এখন শুধু প্রজ্ঞাপনের বিষয়ই বাকি থাকে।
লতিফ সিদ্দিকীর অপসারণ কিভাবে হবে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন তিনি কোনো মন্ত্রীকে তার মন্ত্রিসভায় রাখবেন না তাহলে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার জন্য বলতে পারেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে বলতে পারেন তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য। প্রজ্ঞাপন যখন জারি হবে তখনই এটা বাস্তবায়িত হবে।
সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়া বিষয়ক অন্য বিধানসমূহ
সংসদের সদস্যদের আসন শূন্য হওয়া সম্পর্কিত সংবিধানের অন্যান্য বিধানগুলো হচ্ছে: ৬৭। (১) (ক) ‘তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন: তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন।’ (খ) সংসদের অনুমতি না লইয়া তিনি একাদিক্রমে নব্বই বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকেন; (গ) সংসদ ভাঙ্গিয়া যায়; (ঘ) তিনি এই সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হইয়া যান; অথবা (ঙ) এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। (২) কোন সংসদ সদস্য স্পিকারের নিকট স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন এবং স্পিকার কিংবা স্পিকারের পদ শূন্য থাকিলে বা অন্য কোন কারণে স্পিকার স্বীয় দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ডেপুটি স্পিকার যখন উক্ত পত্র প্রাপ্ত হন, তখন হইতে উক্ত সদস্যের আসন শূন্য হইবে।
৬৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি (ক) কোন উপযুক্ত আদালত তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন; (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করিয়া থাকেন; (গ) তিনি কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বত্সরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বত্সরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে।