জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে বাংলাদেশের যে সরকারি প্রতিনিধি দল অংশ নেয় তাতে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর নাম ছিল না। আমাদের সফরসঙ্গীও উনি ছিলেন না। তার তো আমেরিকা যাওয়ার কথাই ছিল না। উনি ওখানে গেলেন কেন? রবিবার আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এমন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, নিউইয়র্কে দেখা হওয়ার পর জানতে পারলাম উনি (লতিফ সিদ্দিকী) মেক্সিকোতে তার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে যোগদানের আগে নিউইয়র্কে এসেছেন। তবে তার ধর্ম নিয়ে কটূক্তি কখনোই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। বৈঠক সূত্র এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দলীয় নীতি-আদর্শ ও সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যত বড় নেতাই আপত্তিকর বক্তব্য রাখুক, আগামীতে তাদের আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ভাগ্য বরণ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, সব কূলই হারিয়েছেন আলোচিত-সমালোচিত নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। মাত্র ছয় ঘন্টার ব্যবধানে শুধু মন্ত্রিত্ব নয়, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ এমনকি প্রাথমিক সদস্য পদও হারিয়েছেন।
বৈঠক সূত্র আরো জানায়, লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কারের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রবল দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে লতিফ সিদ্দিকী যে বক্তব্য রেখেছেন তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হজ্বসহ ইসলাম ধর্মের প্রতি তিনি কটূক্তি করে গর্হিত অপরাধ করেছেন। এ জন্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম লতিফ সিদ্দিকীর ইস্যুটি নিয়ে বড় কোন বিতর্ক না করার প্রস্তাব করেন। তাত্ক্ষণিকভাবে অধিকাংশ নেতাই এর বিরোধিতা করেন। কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রহমান প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, বিষয়টি এভাবে ধামাচাপা দেওয়া ঠিক হবে না। পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টের আগে সবাই কুলাঙ্গার মুশতাককে আমাদের লোক বলেই জানতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পরিষ্কার হয়েছে ওই বেঈমান মোশতাক কে ছিল? তাই হঠাত্ করে কেন লতিফ সিদ্দিকী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে সরকার ও দলকে বিব্রত অবস্থায় ফেললো তা খুঁজে বের করা উচিত।
সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, আবদুল মতিন খসরু, জাহাঙ্গীর কবির নানক, এ কে এম রহমতউল্লাহ, রবিউল মোক্তাদির চৌধুরী, শুভাষ রায় প্রমুখ। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীসহ প্রায় সব নেতাই লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।
লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেয়ার মূল এজেন্ডা নিয়েই গণভবনে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় শুরু হওয়া বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবেই লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের একজন মন্ত্রী (লতিফ সিদ্দিকী), এখনতো উনি প্রাক্তন মন্ত্রী; যেভাবে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন, এ ধরনের কটূক্তি মেনে নেয়া সম্ভব নয়। আমি জানি না তিনি কেন এ কথা বলেছেন। তবে তিনি যেটা বলেছেন সেটা গর্হিত অপরাধ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সব ধর্মের মানুষ মর্যাদা নিয়ে চলবে এটাই আমরা চাই।
তিনি (লতিফ সিদ্দিকী) এমন সময় এ মন্তব্য করেছেন যখন রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, ক্যাবিনেট সেক্রেটারিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হজ্ব পালনে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দলের কেউ এমন মানসিকতা পোষণ করুক তা আমরা চাই না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজনই বেশি ধর্ম কর্ম পালন করে।
শেখ হাসিনা বলেন, তিনি যখন এ ধরনের মন্তব্য করেছেন তখন আমি দেশের বাইরে ছিলাম। আমার নির্দেশে লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণের ফাইল তৈরি করা ছিল। কালকে (শনিবার) বসে সই করেছি। আজ (গতকাল) গিয়েছি প্রেসিডেন্টের কাছে। সেখানে প্রেসিডেন্টের সইয়ের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এর আগে সভার শুরুতেই কমনওয়েলথ পার্লামেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হওয়ায় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরীকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী ২২ অক্টোবর জাতীয় সংসদে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। ঈদুল আজহা ও শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে সুষ্ঠুভাবে এ দু’টি ধর্মীয় উত্সব পালনে যথাযথ ভূমিকা পালন করায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে সামাজিক অপরাধ হিসাবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট (মৃত্যুদণ্ড) দেয়া হবে। ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ সংক্রান্ত নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিএনপির আন্দোলনের হুমকির জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ রকম আন্দোলনের হুমকি-ধামকি থাকা ভাল। সবাই সজাগ থাকে, অ্যালার্ট থাকে। আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও এবং মানুষ হত্যার মত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আন্দোলন কীভাবে ঠেকাতে হয় সেটা আওয়ামী লীগ জানে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নাকি হতেই দেবে না-বলে হুমকি দেয়া হয়েছিল, গৃহযুদ্ধের হুমকিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আমরা দমন করেছি। এখন মানুষের মধ্যে আস্থা-স্বস্তি, বিশ্বাস ফিরে এসেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, চলার পথে ভুল-ত্রুটি হতে পারে। তবে আমরা তা শোধরাতে পারি। এটা আমরা প্রমাণ করেছি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের আমলে গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সুশীল সমাজের কথিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, সামান্য কিছু লোক আছে, যাদের দল করার সামর্থ্য নেই, ভোট করার ক্ষমতা নেই। শিকা কখন ছিঁড়বে আর তারা কখন ক্ষমতায় যাবে সে চিন্তায় থাকে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সার্কাসের গাধা ও রশিতে চড়া সুন্দরী মেয়ের গল্প তুলে ধরেন।
সরকার প্রধান বলেন, কিছুসংখ্যক লোক আছে যাদের ইয়াহিয়া খান রেখে গেছে, তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কিছু লোক ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে থাকে। এসব সুদখোর, ঘুষখোর, আলবদর-রাজাকারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার কাজে এরা ব্যস্ত। এ সময় তিনি দেশের উন্নয়নে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সময়ের ত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারোর ধর্মে আঘাত করে বক্তব্য রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা কোরআনেই রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা হজ্বযাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করেছি। সুষ্ঠু হজ্ব ব্যবস্থার কারণে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে যেখানে মাত্র ৩৫/৪০ হাজার মানুষ হজ্ব পালন করতে যেতেন, সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার মানুষ এবার হজ্ব পালন করতে গেছেন।
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) নানা হুমকি দিচ্ছেন, দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছেন। তাদের দিয়ে (বিএনপি-জামায়াত জোট) দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তা উনি (খালেদা জিয়া) প্রমাণ করে গেছেন। ক্ষমতায় থাকতে তারা দেশকে সবদিক থেকে পিছিয়ে দিয়ে গেছেন। ইয়াহিয়ার দোসর ও একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তারা দেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, একমাত্র স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয়, দেশের জন্য দরদ থাকে। আর পরাজিত শত্রুরা ক্ষমতায় থাকলে দেশ যে শুধুই পিছিয়ে যায়, তা খালেদা জিয়ারা প্রমাণ করে গেছেন। তারা ক্ষমতায় থাকতে দেশকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। আমরা ক্ষমতায় এসে তা শক্তহাতে দমন করেছি।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ সময় সভায় সাজেদা চৌধুরী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, ওবায়দুল কাদের, কাজী জাফরউল্লাহ, নূহ উল আলম লেনিন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সতীশ চন্দ্র রায়, সাহারা খাতুনসহ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সব নেতাই উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বৈঠক সূত্র আরো জানায়, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শুধু মন্ত্রিত্ব থেকে নয়, দল থেকেও লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণের প্রস্তাব করেন। এ সময় প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাই হাত তুলে কিংবা টেবিল চাপড়িয়ে প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। লতিফ সিদ্দীকির বিষয়টি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কেন্দ্রীয় নেতারা আহবান জানান।
