জিএসপি সুবিধা চাইবে না বাংলাদেশ :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৪, ০০:১৭

জেনারেলাইজড সিস্টেম অফ প্রিফারেন্সেস বা জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজনীতি করছে। তাই বাংলাদেশ আর জিএসপি সুবিধা চাইবে না। তারা (আমেরিকা) যদি মনে করে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবে, তাহলে দেবে। জিএসপি সুবিধা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমেরিকান আইন অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত জিএসপি সুবিধা দেয়া ওই দেশে স্থগিত রয়েছে। ডিসেম্বর মাসের পরে আমেরিকান সরকার এ ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন বলে জানা গেছে।

বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জিএসপি সুবিধা প্রসঙ্গটি দেশের ইমেজের বিষয় হিসেবে তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আর কোন কথা নয়। জিএসপি সুবিধা থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়। আর তাদের ট্যাক্স দিতে হয় ৮০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার ও শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশিদের নানান খবরদারিতে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী। জানা গেছে, শ্রম সংক্রান্ত বিষয়ে বিদেশিদের উদ্বেগের বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপন করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সব দেশ বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে নাক গলায় তাদের নিজেদের দেশের পরিস্থিতি কি তা জানা দরকার। তাদের দেশেও শ্রমিকরা দুর্ঘটনায় পড়ে, অসন্তোষ হয়; কিন্তু সেগুলো পত্রিকায় রিপোর্ট পর্যন্ত হয় না। অথচ আমাদের দেশে কি হল, না হল তা নিয়ে তারা খুব উদ্বিগ্ন থাকেন। শেখ হাসিনা বলেন, আমেরিকার অনেক জনপ্রতিনিধি বাংলাদেশের গার্মেন্টস বিষয়ে চিঠি দেন, উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এখন থেকে ওইসব চিঠির বিপরীতে আমাদের এমপি-মন্ত্রীরাও পাল্টা চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের বিষয়ে জানতে চাইবেন। তখন দেখা যাবে তাদের অবস্থা কেমন হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গার্মেন্টসে কাজ করেন না এমন ব্যক্তিদের শ্রমিক নেতা বানানোর সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা তাদের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে যথেষ্ট কাজ করে যাচ্ছি। পর্যায়ক্রমে আরো উন্নয়ন হবে। তাত্ক্ষণিকভাবে বিদেশিরা যা চাইবে তা হবে না। তারাও (উন্নত দেশ) রাতারাতি উন্নতি করতে পারেনি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। সেটা তাদের মাথায় রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আট শতাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন থাকার বিষয়টি নিয়েও মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি রয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর একজন খুনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জানান। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোন আসামি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন তা আইনমন্ত্রী বলেননি। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর একজন মন্ত্রী এ প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মার্কিন সিনেটররা হুটহাট চিঠি দেয়, বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত চেয়ে এখন আমরাও তাদের চিঠি পাঠাব। এ সময় কয়েকজন মন্ত্রী ওই কথায় পূর্ণ সমর্থন জানান। সূত্র জানায়, আইনমন্ত্রী এ সংক্রান্ত চিঠির একটি ড্রাফট করবেন। পরে অন্য মন্ত্রী-এমপিরা ওই চিঠির আলোকে আলাদা আলাদা চিঠি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পাঠাবেন।
এদিকে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের বিয়ে নিয়ে নিজের বিড়ম্বনার কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানালে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু’র হজ্ব পালন নিয়ে সরস আলোচনা হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। বৈঠকে উপস্থিত একজন মন্ত্রী ইত্তেফাককে বলেন, বৈঠকের এক পর্যায়ে দুই বাম নেতার হজ্ব পালন নিয়ে একজন মন্ত্রী বলেন, দেশে ফিরলে এদেরকে একই সঙ্গে আলহাজ্ব ও কমরেড বলে ডাকা হবে। এসময় কয়েক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হেসে ওঠে ওই মন্ত্রীর বক্তব্য সমর্থন করেন। আগামী ১৫ অক্টোবর হজ্বব্রত পালন শেষে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরবেন রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী জানান, বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে টু-শব্দও হয়নি। প্রধানমন্ত্রীও এনিয়ে কোনো কথা বলেননি। সবার (মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী) চেহারা দেখে আমার মনে হয়েছে, লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে কারও আফসোস কিংবা মন খারাপও নেই।
ট্রেডমার্ক মামলা নিষ্পত্তির সময় বাড়ছে
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভুঁইয়া প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, মন্ত্রিসভায় মোট ছয়টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ‘ট্রেডমার্ক (সংশোধন) আইন-২০১৪’র খসড়া ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তিনি বলেন, ১৯৪০ সালে ট্রেডমার্ক আইন করার পর ১৯৬৩ সালে এ আইনের বিধি প্রণয়ন হয়। ২০০৯ সালে এ আইনটি সংশোধন হয়। তারপরও বিরোধ নিষ্পত্তির সময় ও শব্দগত কিছু অস্পষ্টতা থেকে যায়। তিনি বলেন, পণ্য বা সেবার ট্রেডমার্ক সম্পর্কিত মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা বর্তমানে ১২০ কার্যদিবস রয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে এ সময়সীমা অবাস্তব, এই সময়ে মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হয় না। কারণ ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদী এক প্রক্রিয়া। ৭টি স্তরে এটি সম্পন্ন হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নথিপত্র যাচাই ও সত্যায়নের জন্য দূতাবাসের মাধ্যমে বিদেশেও পাঠানোর প্রয়োজন হয়। তাই প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় এ সময়সীমা বাড়িয়ে ৩৬০ কার্যদিবস করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিল্পমন্ত্রী প্রস্তাবিত আইনের এ খসড়াটি নীতিগত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে ভেটিং সাপেক্ষে তা চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নিউইয়র্ক সফর সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর বর্তমান সরকারের প্রধান হিসেবে এটাই হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সফর। অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সম্মেলন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও গ্লোবাল এডুকেশন ফার্স্ট ইনেশিয়েটিভ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী মন্ত্রী ও উপদেষ্টাবৃন্দও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় যোগ দেন। এছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রয়াসে নিয়োজিত ছিলেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে ২০১৪ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদনও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতিপ্রকৃতি ভাল। এ তিন মাসে মন্ত্রিসভা-বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার প্রায় ৬০ শতাংশ, যা সন্তোষজনক। এছাড়া বৈঠকে গত ২৪-২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের জর্ডান সফর এবং গত ১০-১২ আগস্ট যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সামিট ও গত ২-৪ জুলাই রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রীর অংশগ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়।