কমিশনের আরেকটি নতুন সুপারিশ হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বা স্বাস্থ্য ভাতা থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে রেখে বিনিময়ে তাঁদের পরিবারের সব সদস্যকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ের সুবিধা দেওয়া। কেউ মারা গেলে অথবা দুর্ঘটনার কারণে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লেও দেওয়া হবে আলাদা পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা। তবে সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করবে প্রিমিয়ামের পরিমাণের ওপর। বিমার প্রিমিয়াম কে দেবে, তা নিয়ে একাধিক বিকল্প ভাবছে কমিশন।
এ ছাড়া সবার নামে পাঁচ বছরের জন্য একটি করে স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়ার সুপারিশ করছে কমিশন। এ কার্ড দেখিয়ে সরকারি এবং মাঝারি মানের বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়া যাবে। এক পরিবারের একাধিক সদস্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হলে প্রিমিয়াম জমা হবে শুধু কনিষ্ঠজনের কাছ থেকে। প্রসঙ্গত, এ ধরনের স্বাস্থ্যবিমা পদ্ধতি সারা দেশের জন্য চালুর এক পরিকল্পনা এর আগে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন।
এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের ২০ জনের একটি দলকে পাঁচ কাঠার মতো একটি করে প্লট দেওয়ার সুপারিশ থাকতে পারে বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে। প্লটটি হতে পারে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে। তবে অবশ্যই তা হবে সাশ্রয়ীমূল্যে, যাতে ২০ জন চাকরিজীবী মিলে একই প্লটে বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করতে পারেন।
বর্তমানে বাড়ি করার জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ পান সরকারি চাকরিজীবীরা। মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘পরিমাণটি হাস্যকর।’ ব্যাংকাররা ৫ শতাংশ সুদে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ পান, সচিবালয় বা অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তাহলে কী দোষ হয়ে গেল—প্রশ্ন রাখেন তিনি। বাড়ি করা বা কেনার ঋণ তাই ৪০ মাসের মূল বেতনের সমান করা হতে পারে বলে জানান ফরাসউদ্দিন।
কমিশন চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঋণ হবে সুদযুক্ত, কোনোভাবেই সুদমুক্ত নয়। সুদের হার হতে পারে ৫ শতাংশ।’ এ ধারণা কার্যকর করা গেলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে বলে মনে করেন ফরাসউদ্দিন।
ভাতা যৌক্তিকীকরণ: কমিশনের সুপারিশে কোনো ভাতাই বাতিল করা হচ্ছে না বরং যৌক্তিকীকরণ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর পরিমাণের মিল নেই বলে কমিশন সূত্র জানায়। এগুলোর মধ্যে অবসর সুবিধা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, আপ্যায়ন, প্রেষণ, মহার্ঘ, উৎসব ও শ্রান্তি বিনোদন, ধোলাই ভাতা, টেলিফোন, গাড়ি ও মুঠোফোনবিষয়ক আর্থিক সুবিধা এবং রেশনসুবিধা।
টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বর্তমানে অসংগতি রয়েছে। কমিশন তা-ও দূর করার সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে।
জাতীয় চাকরি ও বেতন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন এ কমিশন বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে। নতুন কাঠামোতে বেতন সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ও সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকার কাছাকাছি সুপারিশ করা হবে। বর্তমান কাঠামোতে বেতন সর্বোচ্চ ৪০ হাজার ও সর্বনিম্ন চার হাজার ১০০ টাকা। সুপারিশ তৈরির ক্ষেত্রে বাবা-মাসহ ছয়জনের একটি পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দুই সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ থাকছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
১৭ সদস্যের এ কমিশন গঠিত হয় গত বছরের ২৪ নভেম্বর, যার মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৪ ডিসেম্বর। মেয়াদ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই সুপারিশসংবলিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দেবেন কমিশন চেয়ারম্যান।
সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিমাসুবিধার আওতায় আনার সুপারিশ করছে জাতীয় চাকরি ও বেতন কমিশন। সরকার এ সুপারিশ গ্রহণ করলে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হবে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য এবং জীবনবিমা ও দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতা বিমা। এর মাধ্যমে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবারের সদস্য মিলিয়ে ৫০ লাখের বেশি মানুষ বিমাসুবিধা পাবে।
