ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষার্থীরা শুধু একবারই পরীক্ষা দিতে পারবে। ভর্তিচ্ছুরা যে বছর এইচএসসি পাস করবে শুধু ওই বছরই ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। পরের বছর আর আবেদন করতে পারবে না। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এতদিন শিক্ষার্থীরা যে বছর এইচএসসি পাস করেছে ওই বছর এবং তার পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারতো। কিন্তু নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীরা আর দুই বার ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে না।
দেশে উচ্চশিক্ষায় তীব্র আসন সংকটের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এইচএসসি পাস ও অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মানদণ্ড কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করবে। তবে এক্ষেত্রে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিও তাদের বিবেচনায় আনা উচিত।
গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির সাধারণ সভায় ভর্তি সংক্রান্ত এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একইসাথে চলতি ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজি বিভাগে ভর্তিতে সাধারণ ইংরেজিতে ১৮ এবং ইলেকটিভ ইংরেজিতে ৮ নম্বর প্রাপ্তিকে শর্ত হিসাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, দ্বিতীয়বার ভর্তির সুযোগের কারণে প্রতিবছর বিভিন্ন বিভাগে অনেক আসন শূন্য থাকে। ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী প্রথম বছর পরীক্ষা দিয়ে এমন একটি বিষয় পেল যে বিষয়ে সে পড়তে আগ্রহী নয়। তবুও সে ওই বিষয়ে ভর্তি হয়ে রইলো। পরের বছর সে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় পেল এবং আগের বিষয় ছেড়ে নতুন বিষয়ে ভর্তি হলো। তখন ছেড়ে দেয়া আসনটি খালিই থেকে যায়। কর্তৃপক্ষ আরেকটি যুক্তি দেখিয়েছে যে, দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বেশি বেশি জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। এছাড়া তারা নতুন শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পায়। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তৈরি হয় বৈষম্য।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুরা দ্বিতীয় দফায় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। ভর্তিচ্ছুরা যে বছর এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস করবে শুধু ওই বছরই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেয়ায় প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিভাগে আসন শূন্য থেকে যায়। আসন যাতে শূন্য না থাকে সেজন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
কলা অনুষদের ডিন ও খ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী অধ্যাপক সদরুল আমিন বলেন, দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা সারা বছর পড়াশুনা করে প্রথমবার অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকে। এছাড়া তারা কোচিং সেন্টারের সহযোগিতা নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি করার চেষ্টা করে। নতুন সিদ্ধান্ত ভর্তিচ্ছুদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে।
দেশে প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীর অনুপাতে বাড়েনি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চ শিক্ষার জন্য পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় প্রথম দিকে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নানা কারণে প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে অন্য কোন একটি পাবলিক বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে শিক্ষার্থীরা। পরের বছর তারা চেষ্টা করে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে মোট আসন ছিল ৮১ হাজার ৫৮১টি। এ শিক্ষাবর্ষে মোট আসন শূন্য ছিল ৪৩৭টি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শূন্য ছিল ৮৯টি আসন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। ভর্তির পরের বছর বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী বিভাগ পরিবর্তন করে অন্য বিভাগে ভর্তি হয়। ফলে এ আসনগুলো শূন্য পড়ে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ ীয় ভর্তি পরীক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ৫টি ইউনিটের অধীনে তিন লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৮০ ভাগ পরীক্ষার্থীই পাস নম্বর তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এর আগের বছর ৫টি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ২৪৭ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৪১ হাজার ৮৯১ জন। পাস নম্বর তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন এক লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৬ জন। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ৮৩ ভাগ এবং ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ৮১ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করতে ব্যর্থ হয়।
ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২০ ভাগই দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, এ শিক্ষার্থীদের অনেকেই উচ্চশিক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করেন। অনেকে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক হওয়ার নজিরও রয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এবছর ভর্তি হতে পারছে না এমন এক শিক্ষার্থীর মা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য একজন শিক্ষার্থীকে প্রচলিত শিক্ষার বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়। পরীক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঢাকায় আসতে হয়। এক্ষেত্রে আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে হয় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। এসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান, কেউ কেউ পান না। একটি পরীক্ষাই একটি শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, কোন কারণে একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা খারাপ হতেই পারে। তার মানে এই নয় যে সে ভালো ছাত্র বা ছাত্রী নয়।
তিনি আরো বলেন, মূলত এ ধরনের শিক্ষার্থী ওগ্রাম-মফস্বলের শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বারের সুযোগের জন্য অপেক্ষা করেন। নতুন সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন কিছুটা হলেও ফিকে করে দিল।
গতকাল রাতে ইত্তেফাক অফিসে ফোন করে এইচএসসি পাস ও অধ্যয়নরত একাধিক শিক্ষার্থী কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। ঢাকার একটি কলেজের ছাত্র মিজানুর রহমান বলেন, দেশে উচ্চশিক্ষায় আসন সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় দ্বিতীয়বার ভর্তির আবেদনের সুযোগ বন্ধ করায় অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের দ্বিতীয় সুযোগও বন্ধ হয়ে গেল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহবান জানান।
এদিকে গতকালের সভায় ইংরেজি বিভাগে ভর্তির শর্ত শিথিল করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। এ বছর এ বিভাগে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের সাধারণ ইংরেজিতে ১৮ এবং ইলেকটিভ ইংরেজিতে ৮ নম্বর প্রাপ্তিকে শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার আগে বলা হয়েছিল ইংরেজিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের সাধারণ ইংরেজিতে ২০ নম্বর ও ইলেকটিভ ইংলিশে ১৫ নম্বর পেতে হবে। কিন্তু শর্তানুযায়ী খ ইউনিট থেকে মাত্র দুইজন শিক্ষার্থী এ বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করে। বিভিন্ন মহলে বিষয়টি আলোচিত হতে থাকে। পরে কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বৈঠক সূত্র জানায়, ইংরেজি বিভাগের ১৫০টি আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন খ ইউনিট থেকে পূরণ করার কথা। বাকি ২৫টি ঘ ইউনিট থেকে পূরণ করার কথা ছিল। কিন্তু শর্ত শিথিলের পরেও খ ইউনিটের পরীক্ষায় মাত্র ১৭ জন ইংরেজি বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা রাখে। এই ইউনিটের বাকী ১০৮টি আসনসহ মোট ১৩৩টি আসনে ভর্তির জন্য সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ঘ ইউনিট থেকে পরীক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন জানান, শর্ত শিথিল করার পরও এবার খ ইউনিট থেকে স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হতে পারবে। কারণ এই ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মোট ১৭ জন শিক্ষার্থী ইলেকটিভ ইংলিশে পাস নম্বর ৮ পেয়েছে। আবার এদের সবাই ইংরেজি বিভাগে ভর্তি নাও হতে পারে।
