লতিফ সিদ্দিকী ২৪ অক্টোবর দল থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছেন

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৪, ২৩:৫০

গঠনতন্ত্র মেনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে আগামী ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করায় দল থেকে স্থায়ীভাবে তাকে কেন বহিষ্কার করা হবে না এই মর্মে একটি কারণ দর্শানো নোটিস পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গতকাল রাজধানীর জিগাতলা পোস্ট অফিস থেকে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে লতিফ সিদ্দিকীর টাঙ্গাইলের কালিহাতির স্থায়ী ঠিকানায় এ নোটিস পাঠানো হয়। দলের প্রেসিডিয়াম পদ থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তও ওই নোটিসে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই নোটিশের জবাব আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জবাব দিতে ব্যর্থ হলে কিংবা যুক্তিসঙ্গত ও সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে আগামী ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে জানা গেছে। 
লতিফ সিদ্দিকীর কাছে পাঠানো কারণ দর্শানো নোটিশে বলা হয়েছে, ‘আপনি (লতিফ সিদ্দিকী) নিউইয়র্কের এক অনুষ্ঠানে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজ্ব, তাবলিগ জামাত ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের বিঘোষিত নীতিমালা, নীতি-আদর্শ, গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র পরিপন্থী কাজ করেছেন। উপমহাদেশের প্রাচীন, গণতান্ত্রিক ও বৃহত্তর জননন্দিত জনমানুষের দল আওয়ামী লীগ আপনার ওই বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আপনার ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও গর্হিত বক্তব্য কেবলমাত্র অনভিপ্রেতই নয়, বাংলাদেশ ও বিশ্বের মুসলিম উম্মাহসহ সকল ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মানুভূতিতে চরম আঘাত হেনেছে। যেহেতু আপনি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলের নীতি-আদর্শ, গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র বিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেছেন, তাই দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আপনাকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম পদ থেকে বহিষ্কার ও প্রাথমিক সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আপনাকে কেন দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, আগামী সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
জানা গেছে, নোটিসটি সোমবার রাতে চূড়ান্ত হয়। এর আগে ওই দিন দুপুরে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নোটিশের খসড়া প্রণয়ন করে গণভবনে পাঠান। রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তা দেখে অনুমোদন দেন। এদিকে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সকল সদস্যকে আগামী ২৪ অক্টোবরের সভায় যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অনুরোধ জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৪৬ (ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারণ দর্শাইবার জন্য সুযোগদানের উদ্দেশ্যে যুক্তিসঙ্গত সময় দিয়া সাধারণ সম্পাদক পোস্টাল রেজিস্টেশনযোগে নোটিশ দিতে বাধ্য থাকিবেন।’ অন্যদিকে গঠনতন্ত্রের ৪৬ (ক) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোন সদস্য আওয়ামী লীগের আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গঠনতন্ত্র ও নিয়মাবলী বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থি কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করিলে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল, কার্যনির্বাহী সংসদ, সংসদীয় বোর্ড বা সংসদীয় পার্টির বিরুদ্ধে কোন কাজ করিলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ তাহার বিরুদ্ধে যে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।’
গঠনতন্ত্রের ৪৬ (খ) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় কমিটির নিকট সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে আপিল করা যাইবে এবং এইরূপ ক্ষেত্রে জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।’ ৪৬ (গ) ধারা অনুযায়ী, ‘আপিলের আবেদন সাধারণ সম্পাদক প্রাপ্তি রশিদ গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় কমিটির নিকট পেশ করিতে বাধ্য থাকিবেন। অন্যথায় জাতীয় কমিটির যে কোন সদস্য সভাপতির অনুমতি লইয়া বিষয়টি বিবেচনা ও সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উত্থাপন করিতে পারিবেন।’ ৪৬ (ঘ) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘ জাতীয় কমিটির সভা আহ্বানের ৭ দিনের মধ্যে উক্ত আপিলের দরখাস্ত সাধারণ সম্পাদকের নিকট পেশ করিতে হইবে। সাধারণ সম্পাদক এইরূপ ক্ষেত্রে উক্ত বিষয়গুলি জাতীয় কমিটির কার্যসূচিভুক্ত করিতে বাধ্য থাকিবেন।’ গঠনতন্ত্রের ৪৬ (ছ) ধারায় বলা আছে, ‘প্রতিষ্ঠানের কোন সদস্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার ক্ষমতা কেবল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের থাকিবে। তবে এক্ষেত্রে ধারা ১৭ (চ) এর ব্যত্যয় ঘটিবে না।’ ১৭ (চ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যে কোন সদস্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদ কর্তৃক গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপিল বিবেচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।’
এদিকে গঠনতন্ত্রের ৪৬ (ঞ) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘সংগঠনের যে কোন শাখা তাহার যে কোন কর্মকর্তা বা সদস্যকে দলের স্বার্থ, আদর্শ, শৃঙ্খলা তথা গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের জন্য স্ব-স্ব পদ বা দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবে। তবে এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন শাখার অনুমোদন প্রয়োজন হইবে এবং এইক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শাখার সাধারণ সভায় দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে। ঊর্ধ্বতন শাখা পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে তাহার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট শাখাকে জানাইবে, অন্যথায় সিদ্ধান্তের সহিত একমত বলিয়া গণ্য হইবে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নোটিসের জবাব দেয়ার মতো মুখ আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর আর নেই। তাছাড়া তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন তাতে তার পক্ষে সন্তোষজনক জবাব দেয়া কখনোই সম্ভব নয়। তাই আগামী ২৪ অক্টোবর দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকী যে দল থেকে বহিষ্কার হচ্ছেন তা নিশ্চিত।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে টাঙ্গাইল জেলা সমিতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজ্ব, তাবলিক জামাত ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন জেলায় এই রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা হয়; সমনও জারি হয়েছে। তার বিচার চেয়ে আন্দোলনের হুমকি দেয় বিভিন্ন ইসলামী দল ও বিএনপি। এমনকি নিজের দলেও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতি) আসন থেকে নির্বাচিত চার বারের এই সংসদ সদস্য। গত রবিবার মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের প্রজ্ঞাপন জারি এবং দলের প্রেসিডিয়াম পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে স্থগিত করা হয় তার দলের প্রাথমিক সদস্য পদ। প্রসঙ্গত, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে পাঁচ বছর তা পালন করেন। এবার তিনি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর প্রতি এখন সামান্যতমও অনুকম্পা নেই আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের। বিএনপিসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন এই ইস্যু নিয়ে আগামীতে যাতে কোনভাবেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে সেজন্য লতিফ সিদ্দিকীকে দল ও সরকার থেকেই শুধু বহিষ্কার নয়, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক থাকুক সেটিও চায় না দলটির নীতিনির্ধারকরা। সেক্ষেত্রে এখন দেশে ফেরার চেষ্টা করলে বিমানবন্দরেই লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠাতেও যে কুণ্ঠাবোধ করা হবে না, তা ইতিমধ্যেই তাঁর পরিবারকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সবুজ সঙ্কেত না দেয়া পর্যন্ত লতিফ সিদ্দিকীকে দেশের বাইরেই থাকতে হবে। একই সঙ্গে লতিফ সিদ্দিকী যাতে এখন দেশের ভেতরে ঢুকতে না পারেন সেজন্য বিমানবন্দর ও সীমান্তের সংশ্লিষ্টদের কাছে মৌখিক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, নোটিস প্রসঙ্গে লতিফ সিদ্দিকী তার মনোভাব ব্যক্ত করে তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে বলেছেন, নোটিসটি হাতে পেলে তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার জবাব দেবেন। গতকাল লতিফ সিদ্দিকী তার এক ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে আরো বলেন, ‘পুরো ঘটনায় তাঁর কোন অনুতাপ বা অনুশোচনা নেই। তবে দল ও আমার নেতাকে (শেখ হাসিনা) বিব্রত অবস্থায় ফেলার জন্য আমি অনুতপ্ত। আমি দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু দেশে ফিরলে আমার নেতা ও দল আরও বেশি বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে কি না, সেজন্য আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। সেজন্যই দেশে ফেরার ব্যাপারে সরকার থেকে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছি।’
এদিকে গতকাল মতিঝিলে জাতীয় শ্রমিক লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভা শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, লতিফ সিদ্দিকী এখন সরকার ও আওয়ামী লীগের কেউ নন। তার বিরুদ্ধে সারা দেশে যেসব মামলা হয়েছে তা স্বাভাবিক গতিতেই চলবে। এ ক্ষেত্রে আইনের কোন ব্যত্যয় হবে না।