নৌপথে আগের মতোই বাড়তি যাত্রী নিয়ে চলছে ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ। নিয়ম-কানুনের কোন তোয়াক্কা নেই। রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনালের প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। গতকাল মঙ্গলবার বিকালেও দেখা গেল একই চিত্র। চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে একটি লঞ্চ। খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছিল ধারণক্ষমতার অনেক বেশি যাত্রী উঠেছে। লঞ্চ ছাড়ার শেষ মুহূর্তে উঠানো হচ্ছিল ঢেউটিনও। লঞ্চের পেছন দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন আরো যাত্রী। কর্মচারীরা তাদের বাধা না দিয়ে বরং ডেকে ডেকে ওঠানো হচ্ছিল।
নিয়ম থাকলেও যাত্রীতে টইটুম্বুর লঞ্চটিতে জীবন রক্ষাকারী কোন বয়া দেখা যায়নি। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কাউকে নজরদারি করতেও টার্মিনালে দেখা যায়নি। বেশির ভাগ লঞ্চেই এভাবে উঠছিলেন যাত্রী। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সূত্র মতে, বর্ষাকালে যে কোনো সময় নদীতে নৌদুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যাত্রী পরিবহনে নিরাপত্তার নিয়ম-কানুন না মানার প্রবণতা ছাড়াও লঞ্চের নির্মাণত্রুটি দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের নৌপথে প্রায় দেড় হাজার ছোট-বড় নৌযান চলছে, যার অনেকগুলোই বিভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বশেষ ১০ বছর আগে ত্রুটিপূর্ণ ৬৭ লঞ্চের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও প্রতিবছর এ ধরনের কার্যক্রম না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলাম জানান, ২০০৪ সালের দিকে ৩৬৭টি ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চের তালিকা করা হয়। পরে ৬৭টি লঞ্চ বিনষ্ট করা হয়। এরপর ২০১৪ সালে আরো একটি তালিকা করা হয়। এই তালিকায় ৭২৫টি লঞ্চকে ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সড়ক, বিমান ও নৌপথে চলাচলকারী যান পরীক্ষা করার জন্য মাঠ পর্যায়ে গবেষণার কাজ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার। অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারে পরীক্ষা করার কথা থাকলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অতীতে কোনো লঞ্চের তথ্য বা নকশা তারা বুঝে পায়নি।
সরকারি জরিপ মতে, ঢাকার সদরঘাট টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন রুটের বেশির ভাগ লঞ্চই চলাচল করে ধারণ ক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে। লঞ্চের অনুমোদিত কাঠামোও বদলে ফেলা হয়, যে কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া অনেক লঞ্চের নকশা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গায়েব হয়ে গেছে। অপরাধ লুকাতেই কৌশলে ফাইল থেকে এগুলো গায়েব করা হয় বলে জানা গেছে।
যাত্রী বহনকারী লঞ্চের নকশা অনুমোদন করে বিআইডব্লিউটিএ। নিবন্ধন দেয় সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। কিন্তু এ দু’টি পক্ষের মধ্যে সমন্বয় হয় না। এছাড়া লঞ্চ যে ডকইয়ার্ডে নির্মাণ হয়, সেখানে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নিয়োজিত তদারককারীরা ঠিকমতো কাজ করেন না বলেও অভিযোগ আছে।
সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, গত মাসে অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত এক সভায় বলা হয়, চালু লঞ্চগুলোর মধ্যে অন্তত ৫শ’ দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই দৈর্ঘ্যে ৪০ মিটারের নিচে।
মূল কাঠের কাঠামোতে লোহা বা ইস্পাতের মতো ধাতব পদার্থ যুক্ত করা এবং উচ্চতা বাড়ানোর কারণে এগুলো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। সভায় এ জন্য এখন থেকে নতুন নকশায় নৌযান তৈরির প্রস্তাব করা হয়। এতে বলা হয়, নকশা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের লিখিত চুক্তি থাকতে হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ইত্তেফাককে বলেন, বেশ কিছু লঞ্চের বিরুদ্ধে অনুমোদিত নকশা লংঘন এবং ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের গুরুতর অভিযোগ আছে। ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চের বিরুদ্ধে অতীতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এখনো নেয়া হচ্ছে। নৌপথে এখনো দুর্বল কিছু লঞ্চ রয়েছে। প্রতিটি টার্মিনালে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে। এ বিষয়ে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে।