ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে বিতর্কিতরাই এগিয়ে

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৪, ২৩:৪৭

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বিদ্রোহে নামছেন সংগঠনটির পদবঞ্চিত নেতারা। গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন পদবঞ্চিতদের সমর্থকরা।

কমিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে দলটির ভেতরেই বিতর্কিতরা এগিয়ে রয়েছেন। হত্যা মামলার আসামি, সংগঠনের মিছিলে গুলি বর্ষণকারী, চাঁদাবাজ, বিবাহিত, ঠিকাদার, চাকরিজীবী, দলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই নতুন কমিটির সামনের সারিতে পদ পেয়েছেন। ছাত্রলীগ ও শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িতদেরও কমিটিতে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্রদলের নেতারাই।
গত মঙ্গলবার রাতে বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের ২০১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি গঠনের তথ্য জানানো হয়। সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব আহসানকে সভাপতি এবং যুগ্ম সম্পাদক আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন, যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। কমিটিতে সহসভাপতি ৩৩ জন, যুগ্ম সম্পাদক ৩৫ জন, সহসাধারণ সম্পাদক ২৭ জন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে ২৮ জনকে মনোনীত করা হয়েছে।
ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কমিটির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, নতুন কমিটির সভাপতি রাজিব আহসানের বিরুদ্ধে দলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। গত আগস্ট মাসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাথে ছাত্রদল নেতাদের বৈঠকে রাজিবের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির কয়েকজন সহসভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক ও সম্পাদক পদের নেতারা। তারা জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে ছাত্রদলকে আন্দোলনের অংশ হিসাবে অন্তত তিন দফায় অর্থ দেয়া হয়। তখন দলটির সভাপতি আব্দুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ কারাগারে ছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পেয়ে রাজিব দলীয় অনুদানের সিংহভাগই নিজে মেরে দিয়ে সংগঠনের অন্যদের সহায়তা করেননি। নতুন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকও সম্প্রতি রাজিবের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলেছিলেন। ঐ বৈঠকে তারা রাজিবের বিরুদ্ধে ক্ষোভও প্রকাশ করেন। তখনকার বৈঠকে রাজিব অভিযোগের জবাব দেননি। তবে গতকাল এ অভিযোগকে তিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের বিরুদ্ধে এর আগে পদবাণিজ্যের অভিযোগ এনে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির অনেক নেতাই বিদ্রোহ করেছিলেন। পরে আকরাম সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিযোগ অস্বীকার করেন। কমিটির দুই নম্বর সহ-সভাপতি মহিদুল হাসান হিরু ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দুই বছরের বেশি সময়। কিন্তু তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ এবং হল কমিটি গঠন করতে পারেননি। এ নেতা লাল্টু-হেলাল কমিটির সময় ছাত্রলীগের হয়ে ছাত্রদলের মিছিলে গুলি ছুঁড়েছিলেন। তখন ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঐ ছবি প্রকাশিতও হয়।
আরেক সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান রেজিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া ছাত্র বলে কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে জানা গেছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। পরে ছাত্রদলে যোগ দেন। অপর সহ-সভাপতি আহমেদ সাইমুমের বিরুদ্ধে ছাত্র শিবিরের রাজনীতি করার অভিযোগ রয়েছে। লন্ডন প্রবাসী চাকরিজীবী শফিকুল ইসলাম রিবলুকেও সহ সভাপতি পদে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সহ-সভাপতি আবদুল হান্নান মিয়া, জয়দেব জয় ও জিয়াউর রহমান জিয়াসহ কয়েকজন চাকরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুগ্ম সম্পাদক ইউনুস আলী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস)। এক নম্বর সহ সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরিরত। প্রচার সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম হিমেল বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের এক ছাত্র হত্যা মামলার প্রধান আসামি। সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা চাকরিজীবী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নতুন কমিটির ৩৩জন সহ-সভাপতির মধ্যে অন্তত ২৫ জনই বিবাহিত। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে। ৩৫ জন যুগ্ম সম্পাদকের মধ্যে অন্তত ২৪জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক ২৭ জনের মধ্যে ১৫জন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ২৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই বিবাহিত। সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাকও বিবাহিত। এদের কয়েকজন ঠিকাদারি ও গার্মেন্টস ব্যবসাও করছেন।
ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সম্পাদক পদের এক নেতা জানান, অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের দিয়ে কমিটি গঠনের পরামর্শও দেয়া হয়েছিল চেয়ারপারসনকে। বিএনপি চেয়ারপারসন এ লক্ষ্যে দলীয় রাজনীতিকসহ কয়েকজন পেশাজীবীর কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছিলেন। সে অনুযায়ীই নতুন কমিটির শ্রেণিকাঠামো গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং বিএনপির সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন এমন দুই নেতা তাদের স্বার্থে দুই রকম পরামর্শ দেন। শ্রেণিকাঠামো ধরে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে অবিবাহিতদের পদায়ন করার পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের অনুসারীদের পদায়ন নিশ্চিত করেন। আবার নিজেদের অনুসারী বিবাহিত অন্য নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন।
বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব ছাত্রদলের দায়িত্বে এসেছে। যোগ্য, দক্ষ ও নিবেদিতদের পদায়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ছাত্রদল একটি বড় সংগঠন। তাই সবাইকে পদায়ন করা সম্ভব নয়। যারা পদবঞ্চিত তাদেরকে মূল দল ও  বিভিন্ন অঙ্গ, সহযোগী দলে পদায়ন করা হবে।’
ছাত্রদলের সদ্যবিদায়ী সভাপতি আবদুল কাদের ভূইয়া জুয়েল বলেন, সংগঠন বৃহত্তর চিন্তা করে নতুন কমিটি গঠন করেছে। সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য তিনি আহবান জানান।
বিএনপি অফিসের সামনে ককটেল
নতুন কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে গতকাল বিকালে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন অর্ধশতাধিক পদবঞ্চিত নেতা ও তাদের সমর্থক। তারা স্লোগান দেন, ‘পকেট কমিটি মানব না, মানি না; দালালি চলবে না; হৈ হৈ রই রই টুকু-এ্যানি গেল কই’। একপর্যায়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ বিক্ষোভরতদের ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করেন। এ সময় অন্তত ছয়টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। পুলিশের হাতে আটককৃতরা হলেন- হাফেজ নাসির হোসেন, তৌহিদ মোল্লা ও বাকি বিল্লাহ।
এ প্রসঙ্গে পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোরশেদ বলেন, ছাত্রদলের নতুন কমিটির বিরুদ্ধে তারা স্লোগান দিচ্ছিল। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কায় পুলিশ তাদেরকে ঐ স্থান ত্যাগ করতে বলে। ককটেল বিস্ফোরণের পর তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদশেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
এদিকে গতকাল দুপুরে নয়া পল্টনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে নবগঠিত কমিটি। এ সময় সভাপতি রাজিব আহসান বলেন, তারুণ্যকে প্রধান্য দিয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ‘বিলুপ্ত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে’ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এ আন্দোলনে সকল ছাত্র সংগঠনের সহযোগিতা কামনা করছি। আন্দোলনে সাফল্য আসবেই।
সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, মামলা-হামলা করে ছাত্রদলকে দমিয়ে রাখা যাবে না। সাফল্য না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। ছাত্রদলকে আধুনিক ও শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার ব্যাপারে কোনো আপস চলবে না।
গুলশানে বিক্ষোভ
নতুন কমিটির পদবঞ্চিত নেতা ও সমর্থকরা রাত ৯টার দিকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানস্থ কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং নতুন কমিটির প্রতি অনাস্থা জানিয়ে স্লোগান দেন। বিক্ষোভে যোগ দেন নব-গঠিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার এবং তার সমর্থকরা। এদিকে বিক্ষোভরতদের বিপরীতে পাল্টা মিছিল ও স্লোগান দেন পদপ্রাপ্ত নেতারা। দু’পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।