দেশে ফসল ভেদে উত্পাদিত খাদ্যের ১২ থেকে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হচ্ছে। মাঠ থেকে ফসল তোলা, মাড়াই, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতসহ অন্তত ছয়টি ধাপে প্রতি বছর এই অপচয়ের ঘটনা ঘটছে। জানা গেছে, দেশে উত্পাদিত গমের ১৮ দশমিক ২ শতাংশ অপচয় হয়। আর মাছের অপচয় হয় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত। ধানের ক্ষেত্রে অপচয় হয় ১২ শতাংশ। আর সর্বাধিক ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত সবজি ও ফল নষ্ট হয়। অপচয় না হলে এই খাদ্য দিয়ে দেশের বাড়তি ১ কোটিরও বেশি মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব বলে মত দিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ ১৬ অক্টোবর ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘পারিবারিক কৃষি: প্রকৃতির সুরক্ষা, সবার জন্য খাদ্য’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, ধানে যে অপচয় হয় তার বেশিরভাগই হয় কৃষকদের সচেতনতার অভাবে। ধান কাটার পর থেকে খাবার ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত অপচয় হয় প্রায় ১২ শতাংশ ধান। কাটার সময় প্রচুর ধান ক্ষেতে পড়ে থাকে, বাড়িতে নেয়ার সময় রাস্তায় ঝরে পড়ে কিছু পরিমাণ, আবার ধান শুকানোর সময়ও অপচয় হয়। অনেক সময় ধান বেশি শুকানো হলে তা ভেঙে যায়। আবার কম শুকানোর কারণে পোকায় ধরে। সঠিক সময়ে সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক ধান নষ্ট হয়। এভাবে ধানের যে অপচয় হয় তা দিয়ে ৭০ লাখ লোককে খাওয়ানো সম্ভব। তবে কৃষকরা সচেতন হলে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে এই অপচয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বছরে ১১ মিলিয়ন টন শাক-সবজি ও ফলমূল উত্পাদিত হয়। যার ৪৪ শতাংশ নষ্ট হয় খাবার টেবিলে পৌঁছানোর আগেই। সবজি ও ফল বেশি অপচয় হয় পরিবহন সমস্যার কারণে। মাঠ থেকে তোলার পর বাজারে বিক্রির আগেই অপচয় হয় বেশি। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক সবজি ও ফল পচে যায়। সঠিক সময়ে ফসল না তোলার কারণেও নষ্ট হয়। আবার দুর্বল বাজার ব্যবস্থার কারণে অনেক দূরে গিয়ে এগুলো বিক্রি করতে হয়। এই সময়েই অনেক সবজি ও ফল রাস্তায় নষ্ট হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা এখন প্রায় ৯২ কোটি ৫০ লাখ। অথচ প্রতি বছর ১৩০ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়। উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণের সময় বিপুল পরিমাণ খাদ্য বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়। এছাড়া অপচয়ের অভ্যাস এবং গুদাম ও মোড়কীকরণের মতো সুবিধার অপ্রতুলতার কারণেও খাদ্য অপচয় হচ্ছে। এর মধ্যে ধনী দেশগুলোর ভোক্তারা বছরে ২২ কোটি টন খাদ্য নষ্ট করছে, যা সাব-সাহারান আফ্রিকার এক বছরের প্রকৃত উত্পাদনের সমান। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ভোক্তাপ্রতি খাদ্য নষ্টের পরিমাণ বছরে ৯৫ থেকে ১১৫ কেজির মতো। এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় এর পরিমাণ ৬ থেকে ১১ কেজি।
বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় রোধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক আনোয়ার ফারুক বলেন, খাদ্য অপচয় রোধে কৃষকদের সচেতন করার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষকদের সহজশর্তে আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি স্তরে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে অপচয় কমে আসবে বলে তার ধারণা।
কর্মসূচি: বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আজ ঢাকায় সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী সেমিনারে প্রধান অতিথি থাকবেন। এছাড়া সারাদেশে শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে কৃষি বিভাগ।